ছয় মাসে সিলেটের ক্যান্সার ইনস্টিটিউট চালুর ঘোষণা

প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্মিত ১০০ শয্যার বিশেষায়িত ক্যান্সার ও কিডনি ইউনিট আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়া এই বিশেষায়িত কেন্দ্রটি নিয়ে যখন রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হতাশা বাড়ছিল, তখন মন্ত্রীর এই ঘোষণা নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

শুক্রবার সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই আশ্বাস দেন। এ সময় তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং চিকিৎসাসেবার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অবহিত হন। ক্যান্সার ও কিডনি রোগীদের জন্য নির্মিত বিশেষায়িত ইউনিটটি দ্রুত চালুর প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

সিলেটে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বর্তমানে তিনটি প্রধান প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও যেসব প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ‘আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় সিলেটে এই বিশেষায়িত কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ১৭ তলা ভিত্তির ওপর ১৫ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৬ টাকা।

২০২১ সালের ১৮ আগস্ট নির্মাণকাজের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ২৪ মাসের মধ্যে ভবন নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে এর ভৌত কাঠামো ও ফিনিশিংয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। দুটি বেজমেন্টসহ ভবনের সিভিল, স্যানিটারি ও অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র চালুর জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন, তার বড় অংশই ইতোমধ্যে প্রস্তুত।

কিন্তু ভবন দাঁড়িয়ে গেলেও সেখানে রোগীদের চিকিৎসা শুরু হয়নি। ফলে সিলেটসহ বৃহত্তর অঞ্চলের ক্যান্সার ও কিডনি রোগীদের কাছে এতদিন ধরে আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রটি ছিল অনেকটা আশার আলো হয়েও অধরা বাস্তবতা। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষায়িত এই কেন্দ্রে জটিল ক্যান্সার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি, ব্র্যাকিথেরাপি এবং ডে-কেয়ার কেমোথেরাপির ব্যবস্থা থাকার কথা। পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক আধুনিক ওয়ার্ডের পাশাপাশি সার্জিক্যাল ব্লক, নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং কিডনি রোগীদের জন্য নেফ্রোলজি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। থাকবে আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার ও ডে-কেয়ার কার্ডিয়াক সেন্টারের সুবিধাও।

চিকিৎসাসেবা চালু করতে দেরির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রয়োজনীয় জনবল অনুমোদনের বিলম্ব এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অন্যতম। বিশেষ করে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও আমদানির ক্ষেত্রে সময় এবং অর্থ—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যান্সার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর ও ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক হিসাব যখন করা হয়েছিল, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ১০৯ টাকা। পরবর্তী সময়ে সরকারি হিসাবে ডলারের মূল্য ১২৩ টাকায় উন্নীত হওয়ায় আমদানি করা সরঞ্জামের ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে আগের ব্যয়ে যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সিলেট গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিছু আনুষঙ্গিক কাজ ও লিফট স্থাপনের বিষয় বাকি রয়েছে। লিফট কেনার জন্য একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও পুরোনো দরে কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহে আগ্রহ দেখায়নি। এ কারণে নতুন করে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মনসুর রহমানও জানিয়েছেন, ভবন নির্মাণের কাজ শেষ। প্রায় এক বছর ধরে ভবন হস্তান্তরের অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আসবাব ও লিফট স্থাপনের কাজসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু কার্যক্রম সম্পন্ন হলেই ভবন বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক ডা. তৌফিক হাসান ফিরোজ জানিয়েছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। এসব কারণে নতুন করে ব্যয় হিসাব করে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

জনবল সংকটও বিশেষায়িত কেন্দ্রটি চালুর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকল্প পরিচালক জানান, আটটি কেন্দ্রের জন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার পদ সৃষ্টির একটি নতুন প্রস্তাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদনের পর পর্যায়ক্রমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে প্রকল্প পরিচালক যেখানে হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছয় মাসের মধ্যে চালুর ঘোষণা রোগীদের জন্য নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, অবশিষ্ট অবকাঠামোগত কাজ, জনবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও স্থাপন—সবকিছু এত অল্প সময়ে সমন্বয় করে কীভাবে চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে।

সিলেট বিভাগের ক্যান্সার ও কিডনি রোগীদের জন্য বিষয়টি নিছক একটি অবকাঠামো নির্মাণের প্রশ্ন নয়; এটি জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত বাস্তবতা। প্রতিদিন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে জায়গা ও চিকিৎসার জন্য রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি কিংবা ডায়ালাইসিসের জন্য অনেক রোগীকেই ঢাকায় যেতে হয়। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা অনেক সময় দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

একজন ক্যান্সার রোগীর জন্য চিকিৎসার প্রতিটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয়ের পর সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হলে শারীরিক জটিলতা যেমন বাড়তে পারে, তেমনি পরিবারের ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপও ক্রমাগত বাড়ে। একইভাবে কিডনি রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হলে দূরের শহরে যাতায়াত করা তাদের জন্য শারীরিক ও আর্থিক—দুই দিক থেকেই কঠিন হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতায় সিলেটে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ক্যান্সার ও কিডনি চিকিৎসাকেন্দ্র চালু হলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হাজারো রোগী উপকৃত হতে পারেন। বিশেষ করে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ অনেকটাই সহজ হবে।

তবে শুধু ভবন চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দ্রুত সংগ্রহ, স্থাপন ও কার্যকর করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রটি চালুর ঘোষণা তাই সিলেটবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে সামনে এসেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়, তাহলে শুধু একটি ভবনই কার্যকর হবে না, বরং সিলেটের স্বাস্থ্যসেবায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। এখন রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা—কবে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেবে এবং কবে সিলেটেই তারা প্রয়োজনীয় ক্যান্সার ও কিডনি চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

লংমার্চে কোটি টাকার লোকসানের দাবি রাশেদ খানের

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বে খলিলুর রহমান

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিসিক নির্বাচনে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী ড. বাবুল

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চাইনিজ তাইপেকে উড়িয়ে বাংলাদেশের দারুণ জয়

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ছয় দফা দাবিতে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলের লংমার্চ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

লংমার্চে কোটি টাকার লোকসানের দাবি রাশেদ খানের

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বে খলিলুর রহমান

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিসিক নির্বাচনে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী ড. বাবুল

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চাইনিজ তাইপেকে উড়িয়ে বাংলাদেশের দারুণ জয়

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ছয় দফা দাবিতে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলের লংমার্চ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটের ট্রিপল মার্ডার: পিবিআইতে যাচ্ছে তদন্ত

প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘের আগে ভারত সফর নয় প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ