প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের দলবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে কোনো সাবেক বিচারপতির রাজনৈতিক দলে আনুষ্ঠানিক যোগদান স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে বিশেষ আলোচনা তৈরি করে। হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানও তেমনই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ তার রাজনৈতিক পরিচয়ের নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে আবার সামনে এসেছে বিচারিক জীবনের একটি দীর্ঘ, বিতর্কিত এবং আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকালে রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে সৈয়দ শাহিদুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েকশ ব্যক্তি দলটিতে যোগ দেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, আলেম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।
সৈয়দ শাহিদুর রহমানের এই রাজনৈতিক যোগদানকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার বিচারিক জীবনের সেই ঘটনা, যার পরিণতিতে তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারকের পদ হারিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে জামিনসংক্রান্ত বিষয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছিল এবং সেই অভিযোগ তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়। পরবর্তীতে কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপতির দেওয়া অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
মামলার নথি ও আদালতের প্রকাশিত রায়ের তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দ শাহিদুর রহমান ২০০৩ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। সে সময় বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। নিয়োগের কয়েক মাসের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।
এক নারী অভিযোগ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় জামিন করিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অর্থ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগটি তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের নজরে আসে। বিষয়টি পরে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় আনুষ্ঠানিক তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০০৩ সালের অক্টোবরে আইনজীবীদের এক সভায় অভিযোগটির বিষয় প্রকাশ্যে আলোচিত হয়। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতিকে বিষয়টি অবহিত করার পর অভিযোগ তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুহুল আমিন এবং বিচারপতি মো. ফজলুল করিম সদস্য ছিলেন। কাউন্সিল অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অভিযোগের প্রমাণের মাত্রা নিয়ে কাউন্সিলের পর্যবেক্ষণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগটি এমনভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি, যাতে সব প্রশ্নের অবসান ঘটে; তবে অভিযোগের সমর্থনে কোনো উপাদান নেই বা সেটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন—এমন কথাও বলা যায় না। কাউন্সিলের মতামত ছিল, ওই পরিস্থিতিতে সৈয়দ শাহিদুর রহমানের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্বে থাকা সমীচীন নয়।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশের পর ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তাকে পদ থেকে অপসারণ করেন। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তৎকালীন সাংবিধানিক বিধানের আওতায়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচিত হয় এবং একজন উচ্চ আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত ও অপসারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
তবে এখানেই শেষ হয়নি আইনি লড়াই। পদচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অপসারণের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সৈয়দ শাহিদুর রহমান হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রাষ্ট্রপতির দেওয়া অপসারণের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়।
হাইকোর্টের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হন। জনস্বার্থের বিষয়টি সামনে এনে তিনি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন। একই বছরের এপ্রিলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার পথ খুলে দেয়।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় চলতে থাকে। প্রায় এক দশক পর ২০১৫ সালে মামলাটির শুনানি আপিল বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ মামলাটি শুনানি করে।
২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া আগের রায় বাতিল করে। এর ফলে ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতির দেওয়া সৈয়দ শাহিদুর রহমানের অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্বে ফেরার আইনি পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
মামলাটির পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ভূমিকা, বিচারকদের আচরণ এবং সাংবিধানিক কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। আদালত বিচার বিভাগের মর্যাদা, সততা এবং জনআস্থা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়। উচ্চ আদালতের বিচারকদের আচরণ নিয়ে পরবর্তীকালে আলোচিত নীতিগত নির্দেশনাগুলোর ক্ষেত্রেও এই মামলার রায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
আপিল শুনানিতে আপিলকারী পক্ষের হয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অংশগ্রহণ করেন। অপরদিকে সৈয়দ শাহিদুর রহমান নিজের পক্ষে নিজেই আদালতে শুনানি করেন।
দীর্ঘ সেই বিচারিক ইতিহাসের পর প্রায় দুই দশক পেরিয়ে এখন তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে তার আনুষ্ঠানিক যোগদানকে কেন্দ্র করে তাই শুধু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নয়, তার অতীত বিচারিক জীবনও আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া একজন নাগরিকের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার হলেও, সৈয়দ শাহিদুর রহমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হওয়ার কারণ তার অতীত পরিচয়। তিনি একসময় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক ছিলেন। পরে একটি গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাংবিধানিক তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ বহাল রাখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাবেক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা যোগ করে। তবে বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশেষভাবে জনআলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, কারণ বিচার বিভাগের মূল ভিত্তি হিসেবে নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা ও জনআস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
সৈয়দ শাহিদুর রহমানের জামায়াতে যোগদানের ঘটনাও তাই শুধু একটি রাজনৈতিক যোগদানের খবর হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার অতীতের বিচারিক ইতিহাস, অপসারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কারণে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তার বিচারিক জীবনের ঘটনাগুলো আদালতের নথি ও রায়ের মাধ্যমে বহু আগেই একটি আইনি পরিণতিতে পৌঁছেছে। ২০১৫ সালে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে ২০০৪ সালের অপসারণের আদেশ বহাল থাকার পর সেই অধ্যায়ের আইনি অবস্থানও স্পষ্ট হয়।
এখন জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের মধ্য দিয়ে সৈয়দ শাহিদুর রহমানের জীবনে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। কিন্তু তার এই নতুন পথচলার সঙ্গে অতীতের বিতর্কিত বিচারিক অধ্যায়ও যে জনপরিসরে বারবার ফিরে আসবে, সাম্প্রতিক আলোচনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।


