প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডার মামলায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের সন্তানরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে সেই আশ্বাসের পরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিলেটবাসীকে জানাবেন বলেও তারা ঘোষণা দিয়েছেন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সিলেট মহানগরের জল্লারপার এলাকায় খান হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা শিখা ও তারানা সুলতানা শিমু পরিবারের পক্ষ থেকে এসব কথা বলেন। এটি হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবারের দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলন।
সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, তাদের পরিবারের দাবি কোনো জটিল বা অস্বাভাবিক দাবি নয়। তারা শুধু চান, মা-বাবা ও গৃহকর্মী হত্যার ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক এবং যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক। তদন্তে কোনো প্রভাব, পক্ষপাত বা গাফিলতি যেন না থাকে, সেটিই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
নিহতদের সন্তানরা জানান, মঙ্গলবার সিলেট সফরে আসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ সময় তারা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত বিচারের বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছেন এবং সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিহত দম্পতির মেয়েরা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসের পর তারা আশাবাদী যে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে এবং পরিবার ন্যায়বিচার পাবে। তবে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় যদি তারা সন্তুষ্ট না হন কিংবা প্রকৃত সত্য সামনে না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা নতুন করে নিজেদের অবস্থান ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত জনগণের সামনে তুলে ধরবেন।
তারা বলেন, “আমাদের দাবি একটাই—এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক বিচার। আমরা বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছি। তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা এখন আশাবাদী যে, ন্যায়বিচার পাব।”
এই কঠিন সময়ে সিলেটের সাংবাদিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নিহতদের সন্তানরা। তারা বলেন, পরিবারের সদস্যদের হারানোর পর সিলেটবাসী যেভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন, তা তাদের শোকের মুহূর্তে সাহস জুগিয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। তারা মনে করেন, একটি আলোচিত ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনসচেতনতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা তদন্তকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নিহত দম্পতির মেয়েরা স্পষ্ট করেন যে, তারা মামলার এজাহারে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি অভিযুক্ত করেননি। তবে তাদের বাবার জায়গা-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি পুলিশের নজরে আনা হয়েছে।
তারা বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তদন্তকারী সংস্থাকে সম্ভাব্য বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। এখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনার দায়িত্ব পুলিশের।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা শুরু থেকেই এমন একটি তদন্ত চান, যেখানে পূর্বধারণা বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা হবে না। আবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা সম্ভাব্য সূত্রও উপেক্ষা করা হবে না। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যেভাবে সামনে আসবে, পরিবার সেই সত্যই জানতে চায়।
উল্লেখ্য, গত ১২ আগস্ট সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক এম এ সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং তাদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (১৫)।
একই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু সিলেটজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে একই পরিবারের প্রবীণ দম্পতি ও এক কিশোরী গৃহকর্মীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি করে।
হত্যাকাণ্ডের দিন পুলিশ বাবুল মিয়া নামে এক রংমিস্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ বাবুল মিয়ার বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে সম্পর্কের জের ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে পরবর্তীতে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার পেছনে ভিন্ন কারণের কথা উঠে আসে বলে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে টাকা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর তিনজনকে হত্যার কথা বলা হয়েছে।
এই ভিন্ন বক্তব্যের কারণেই হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা নিয়ে আরও গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন, মামলার প্রতিটি তথ্য, আলামত ও সম্ভাব্য সূত্র অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
বর্তমানে গ্রেপ্তার হওয়া বাবুল মিয়া কারাগারে রয়েছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর, গত ১৭ আগস্ট, নিহত দম্পতির প্রবাসী ছেলে-মেয়েরা নিজেদের বাসায় প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেই সংবাদ সম্মেলনেও তারা ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
তখন তারা বলেছিলেন, তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে তারা সন্তুষ্ট না হলে মামলাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগে বা অন্য কোনো বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরের বিষয়েও বিবেচনা করা উচিত।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বিভিন্ন পক্ষ থেকেও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। গত সোমবার এ বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও লিজগ্রহীতাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটি’। সেখানে তদন্ত ও জবানবন্দি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়।
এসব অভিযোগের সত্যতা এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। অভিযোগ বা পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এমন একটি অনুসন্ধান নিশ্চিত করা, যাতে ঘটনাটির প্রতিটি প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়।
একটি পরিবারের তিনজন সদস্যকে হারানোর এই ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়, নিহতদের স্বজনদের জন্য এটি অপূরণীয় ব্যক্তিগত শোকের বিষয়। তাই মামলার তদন্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিহতদের সন্তানরা বলছেন, তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চান। তাদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে এবং যারাই অপরাধে জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসের পর পরিবার নতুন করে আশাবাদী হলেও তারা এখন তদন্তের অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মতে, ন্যায়বিচারের প্রকৃত প্রমাণ হবে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটন এবং আইনের মাধ্যমে অপরাধীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা।


