প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের নানা বিতর্ক ও অভিযোগের মধ্যে বহুল আলোচিত উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমানকে রাঙামাটিতে বদলি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে রাঙামাটি জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক পদে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোমবার, ৩১ আগস্ট জারি হওয়া ওই প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মুহাম্মদ মকবুল হোসেন স্বাক্ষর করেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে মো. নিয়াজুর রহমানকে। নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর বা অবমুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে ৪ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত বা স্ট্যান্ড রিলিজ হিসেবে গণ্য করা হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও অভিযোগ ছিল। নিয়াজুর রহমান এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী সিলেট সদর উপজেলার মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সুবর্ণা রায় তুলিকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
এর আগে ডা. সুবর্ণা রায় তুলিকেও সিলেট থেকে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে বদলি করা হয়। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা তার বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। ফলে একই পরিবারের দুই আলোচিত কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয়টি সিলেটের প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডা. সুবর্ণা রায় তুলির গত ১৮ আগস্ট জগন্নাথপুরে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত তারিখের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তিনি জগন্নাথপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি বলে স্থানীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার দিকে জগন্নাথপুর হাসপাতাল এলাকায় অবস্থিত পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। সে সময় কার্যালয়ের অফিস সহকারী নির্মল দেবনাথ জানান, ডা. সুবর্ণা রায় তুলি তখন পর্যন্ত জগন্নাথপুরে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।
তবে পরে জানা যায়, জগন্নাথপুরে সরাসরি যোগদান না করে তিনি গত ২৫ আগস্ট সুনামগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক বিধি ও বদলির আদেশ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ঘিরে মো. নিয়াজুর রহমান ও ডা. সুবর্ণা রায় তুলির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ উঠছিল। অভিযোগগুলোর মধ্যে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনিক মহলে আলোচিত হলেও প্রত্যেকটি অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সেবা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সাধারণ মানুষের আস্থার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। কারণ পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটের মতো বড় ও জনবহুল অঞ্চলে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কার্যক্রম শুধু দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সচেতনতা এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের সঙ্গে এই বিভাগের দায়িত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
একটি সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলতে থাকলে তার প্রভাব কর্মপরিবেশের ওপর পড়তে পারে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বিষয়টি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়াজুর রহমানকে সিলেট থেকে রাঙামাটিতে বদলির আদেশের পর সংশ্লিষ্ট মহলে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণ এবং সিলেটে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দপ্তরের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসবে কি না, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন অভিযোগ ও অসন্তোষের অবসান হবে কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে ডা. সুবর্ণা রায় তুলির বদলি এবং জগন্নাথপুরে নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগদানের বিষয়টিও প্রশাসনিকভাবে আলোচনায় রয়েছে। বদলির আদেশ অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা নির্ধারিত কর্মস্থলে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার বিষয়।
সরকারি চাকরিতে বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও কোনো কর্মকর্তা বা দপ্তরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর বদলির ঘটনা ঘটলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই জনআলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তবে বদলির কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না থাকলে শুধু কর্মস্থল পরিবর্তনের ঘটনাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সিলেট থেকে রাঙামাটিতে মো. নিয়াজুর রহমানের বদলি এবং সিলেট থেকে জগন্নাথপুরে ডা. সুবর্ণা রায় তুলির বদলির ঘটনাকে ঘিরে তাই বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করতে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন না করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হলে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হয়।
সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়কে ঘিরে আলোচিত এই বদলির ঘটনায় এখন নজর থাকবে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে। মো. নিয়াজুর রহমান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাঙামাটিতে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন কি না এবং ডা. সুবর্ণা রায় তুলির কর্মস্থলসংক্রান্ত বিষয়টি কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের আগ্রহ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের আলোচনা ও অভিযোগের পর সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তার বদলির ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগ ও বিতর্কের বাইরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সেবা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।


