নুসরাত হত্যা: সিরাজসহ ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই রায়ে চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলার উচ্চ আদালতের রায় ঘিরে নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলো।

সোমবার দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ আলোচিত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এই রায়ের মধ্য দিয়ে নিম্ন আদালতে দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নিম্ন আদালতে সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। চারজনের সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামির মধ্যে রয়েছেন নুসরাতের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ ও তদন্তে সিরাজ উদদৌলার ভূমিকা আলোচনায় আসে। নুসরাতের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ প্রত্যাহারে চাপ এবং পরে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে।

হাইকোর্টের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি এবং জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন। অন্যদিকে সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

আদালতে আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।

নুসরাত হত্যা মামলার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ২০১৯ সালের মার্চে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা নুসরাত জাহান রাফির বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। মামলার নথি অনুযায়ী, ২৭ মার্চ মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে নুসরাতকে ডেকে নেন। সেখানে তার সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ ওঠে। পরে এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করেন নুসরাতের পরিবার।

অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে উঠে আসে। কিন্তু অভিযোগ থেকে সরে না আসায় তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। পরিস্থিতির মধ্যেই ৬ এপ্রিল ঘটে ভয়াবহ সেই ঘটনা, যা পরবর্তী সময়ে পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।

সেদিন নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।

নুসরাতের মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সামাজিক ও নাগরিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। দ্রুত বিচার ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। পরে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে সিরাজ উদদৌলাসহ মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

নিম্ন আদালতের সেই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সোমবার হাইকোর্ট মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। উচ্চ আদালতের রায়ে নিম্ন আদালতের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকলেও সব আসামির ক্ষেত্রে তা বহাল রাখা হয়নি।

নুসরাত হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যামামলা হিসেবে নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং অভিযোগ জানানোর পর তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে একজন শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর পরও কীভাবে তাকে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা নিয়ে সে সময় দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়।

নুসরাতের পরিবারের জন্য এই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ছিল একই সঙ্গে অপেক্ষা, বেদনা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার সময়। মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে তারা আদালতের রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। নিম্ন আদালতের রায়ে সব আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরও উচ্চ আদালতের আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলাটির আইনি নিষ্পত্তি সম্পূর্ণ হয়নি। হাইকোর্টের রায় সেই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে হাইকোর্টের রায়ে ১০ আসামি খালাস পাওয়ায় মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আইনি আলোচনা অব্যাহত থাকার সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় উচ্চ আদালতের রায়ের পর নির্দিষ্ট আইনি সুযোগ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পথ খোলা থাকে।

নুসরাত হত্যা মামলার রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় নারী নির্যাতন ও সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবেও আলোচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষার্থীর ওপর ধারাবাহিক চাপ, ভয়ভীতি এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

এই মামলার মধ্য দিয়ে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—নির্যাতনের অভিযোগ জানানো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী বা ভুক্তভোগী অভিযোগ জানানোর পর তাকে যেন প্রতিশোধ, সামাজিক চাপ কিংবা ভয়ভীতির মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে।

নুসরাতের মৃত্যুর পর তার নামটি দেশের মানুষের কাছে প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তার পরিবার যে ক্ষতির মধ্য দিয়ে গেছে, কোনো আদালতের রায়ই সেই ব্যক্তিগত শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তবে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধের দায় নির্ধারণ এবং আইনের আওতায় শাস্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা একটি রাষ্ট্রের বিচারিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হাইকোর্টের সর্বশেষ রায়ে সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় মামলার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে আদালতের অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে চারজনের সাজা আমৃত্যু কারাদণ্ডে পরিবর্তন এবং ১০ জনকে খালাস দেওয়ার মাধ্যমে উচ্চ আদালত প্রমাণ ও আইনি মূল্যায়নের ভিত্তিতে আসামিদের দায়ের মাত্রায় পার্থক্য করেছেন।

নুসরাত হত্যা মামলার এই রায় এখন পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে। তবে প্রায় সাত বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তীব্রভাবে জড়িয়ে আছে। একজন তরুণ শিক্ষার্থীর জীবন কেড়ে নেওয়া সেই ঘটনা সমাজে যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছিল, সেগুলোর গুরুত্বও আজ পর্যন্ত কমেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ, অভিযোগকারীর সুরক্ষা এবং নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত করাই হতে পারে নুসরাতের মতো আর কোনো প্রাণ যেন একই পরিণতির শিকার না হয়, তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে ভালো স্থানীয় নির্বাচন চান সিইসি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঘুমন্ত কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কাজ করছে ঢাকা-দিল্লি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জৈন্তাপুরে বালু উত্তোলনে অভিযান, ১০ বারকি নৌকা জব্দ

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জমি বিরোধে শিশুকন্যা হত্যা, বাবার মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে ভালো স্থানীয় নির্বাচন চান সিইসি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঘুমন্ত কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেফতার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কাজ করছে ঢাকা-দিল্লি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জৈন্তাপুরে বালু উত্তোলনে অভিযান, ১০ বারকি নৌকা জব্দ

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জমি বিরোধে শিশুকন্যা হত্যা, বাবার মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অজু ও চাল ধোয়ায় পানি কমাতে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগ

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নতুন সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে বাসার সামনে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ