তারেকের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক যখন নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধে নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে এখনো সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।

সফরটি শেষ পর্যন্ত হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের ক্ষেত্রে এ সফরকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটি কতটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে, তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে এই সফরের মাধ্যমে।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সফরকে সামনে রেখে দিল্লি ও ঢাকায় প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের তারিখ ঘোষণা করেনি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও এর আগে জানিয়েছেন, ভারত সফরের বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে, তবে দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনেও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে ব্রিকসের আমন্ত্রণের ধরন নিয়ে ঢাকার অসন্তোষও প্রকাশ পেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীকে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য ভারত সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। কারণ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা।

বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি সফরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হতে পারে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধও জানানো হয়েছে।

ভারত অবশ্য বিষয়টি আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরে এ বিষয়টি কীভাবে আলোচনায় আসে, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ভিন্নমত রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর করা উচিত নয়। ফলে সফরটি শুধু কূটনৈতিক নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

সম্ভাব্য সফরের আগে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ছে। গত সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সেই বৈঠকের পরই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফরের খবর প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে।

সফর হলে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনও দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, এর নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে প্রায় এক যুগ ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিও বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার।

সীমান্তে প্রাণহানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও দুই দেশের আলোচনায় থাকতে পারে। দীর্ঘদিনের এসব সমস্যার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভারসাম্য ও ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়েও ঢাকার প্রত্যাশা রয়েছে।

অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করাও নয়াদিল্লির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকারের সময় তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর এবং ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি বৈঠক দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা ও সমঝোতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব ইস্যু আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ের আলোচনায় দীর্ঘদিন আটকে আছে, সেগুলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনায় নতুন গতি পেতে পারে।

তারেক রহমানের জন্যও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দিল্লি সফরে তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারের অবস্থান সরাসরি ভারতীয় নেতৃত্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে নয়াদিল্লিও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশা স্পষ্ট করার সুযোগ পাবে।

এখন মূল প্রশ্ন সফরের দিনক্ষণ। ঢাকা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যকে সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং একাধিক পর্যায়ের যোগাযোগের কারণে সফরের সম্ভাবনা যে জোরালো হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর শুধু দুই দেশের শীর্ষ নেতার একটি বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনাও হতে পারে। সেই নতুন অধ্যায়ে পারস্পরিক স্বার্থ, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নগুলো কীভাবে জায়গা পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ মৃত্যু

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফেরারি হয়েও ইউপি কার্যক্রমে সক্রিয়, আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ময়লার স্তূপে মিলল মানুষের খণ্ডিত পা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

খালেদা জিয়ার জন্মদিনে দেশজুড়ে বিএনপির দোয়া মাহফিল

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিটি করপোরেশনসহ ৫ নির্বাচনের পথে সরকার

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ মৃত্যু

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফেরারি হয়েও ইউপি কার্যক্রমে সক্রিয়, আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ময়লার স্তূপে মিলল মানুষের খণ্ডিত পা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

খালেদা জিয়ার জন্মদিনে দেশজুড়ে বিএনপির দোয়া মাহফিল

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিটি করপোরেশনসহ ৫ নির্বাচনের পথে সরকার

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট-তামাবিল সড়কে পিকআপ উল্টে প্রাণ গেল যুবকের

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির জানাজা আজ, মামলা করবেন ছেলে

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইউনূসের জন্য সিসিইউ বেড সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ