প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকারের পাঁচ ধরনের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এসব নির্বাচনের মধ্যে রয়েছে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে কোন নির্বাচন আগে এবং কোনটি পরে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
শুক্রবার দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ সড়কের হরিজন পল্লিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নির্মাণাধীন একটি ভবন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমিশনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের সময়সূচি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। কোন ধরনের নির্বাচন আগে আয়োজন করা হবে এবং কোনটি পরে হবে, তা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই ঠিক করা হবে।
তিনি জানান, পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে আনুমানিক সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এ নির্বাচনের জন্য জাতীয় বাজেটেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি নাগরিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক, পানি নিষ্কাশনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সেবার ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। তবে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, আইনগত ও প্রশাসনিক বিষয় এবং অর্থের সংস্থানসহ বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনা করে ধাপে ধাপে নির্বাচনের আয়োজন করা হতে পারে।
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের সরকারি ভবনগুলোকে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।
মীর শাহে আলম বলেন, শুধু অফিস আদেশ জারি করে সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ শেষ করা হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তারও মূল্যায়ন করা হবে। সোলার প্যানেল স্থাপনের ছয় মাস পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ বিল পর্যালোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ ব্যয় কতটা কমেছে এবং উদ্যোগটি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা যাচাই করা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের সাশ্রয় হতে পারে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
শ্রীমঙ্গলের অন্যতম দীর্ঘদিনের সমস্যা ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন তিনি। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরেও রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই তাকে শ্রীমঙ্গলে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার পক্ষ থেকে বর্জ্য ফেলার জন্য একটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই এলাকার আশপাশে বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় স্থানীয়দের আপত্তি তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন করে শহর থেকে কিছুটা দূরে এমন একটি সরকারি জায়গা খোঁজা হচ্ছে, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশ বা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
তবে শুধু একটি জায়গা নির্ধারণ করে সেখানে ময়লা ফেলে রাখার পরিবর্তে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সম্ভাব্য প্রকল্পে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে জমে থাকা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত একজন পরামর্শককে শ্রীমঙ্গলে পাঠানো হবে। ওই পরামর্শককে লন্ডন থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। পরামর্শক স্থানীয় বাস্তবতা পর্যালোচনা করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও সুপারিশ দেবেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
শ্রীমঙ্গলের মতো পর্যটননির্ভর শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নয়, পর্যটন পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শহরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে শহরের পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ এবং পর্যটন ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ স্থানীয়দের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার শহরের কলেজ রোডের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রতিমন্ত্রী। পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শনের সময় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার বিষয়ও উঠে আসে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শহরের দৈনন্দিন জীবন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের আবাসন ও জীবনযাত্রার নানা সমস্যা দীর্ঘদিনের। নির্মাণাধীন ভবনটি তাদের জন্য আবাসন সুবিধা তৈরিতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
প্রতিমন্ত্রীর শ্রীমঙ্গল সফরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক শরফরাজ আহমেদ শরফু, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান, পৌর প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চলতি অর্থবছরের মধ্যে পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আসায় এখন নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির দিকেই নজর থাকবে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কমিশন ও সরকার কীভাবে সময়সূচি নির্ধারণ করে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিক থেকে দেশের জন্য একটি ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে।


