প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায় নিজ বাসায় নৃশংসভাবে নিহত প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের জানাজা ও দাফন আজ শুক্রবার সম্পন্ন হবে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বাদ আসর সিলেটের শাহী ঈদগাহে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে নয়াসড়ক এলাকার হযরত মানিক পীর (রহ.) মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হবে।
বাবা-মায়ের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে যুক্তরাজ্য থেকে একমাত্র ছেলে আরিফ ইফতেখার শুক্রবার দেশে ফিরেছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্য থেকে দুই মেয়ে সিলেটে পৌঁছান। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে আজ দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় মামলা করা হবে বলে জানা গেছে।
আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের চার সন্তানই দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে বসবাস করছেন। তাঁদের দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং এক মেয়ে ও একমাত্র ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। আকস্মিক এই হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে সন্তানদের দেশে ফিরতে হয়েছে বাবা-মায়ের শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়ার জন্য। স্বজনদের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি পরিবার মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোকের পরিবারে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে দুই মেয়ে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে বাবা-মায়ের মরদেহ গ্রহণ করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ জানাজা ও দাফনের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মো. মাঈনুল জাকির জানিয়েছেন, নিহত দম্পতির ছেলে দেশে ফেরার পর এ ঘটনায় মামলা করা হবে। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটক বাবুল মিয়াকে বৃহস্পতিবার আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটকের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় বাবুল মিয়াকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি হওয়ার পর তদন্তের পরবর্তী ধাপ আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত বুধবার সকালে সিলেট নগরের রায়নগরের মিতালী এলাকার ‘মিতালী ১১১ নিকুঞ্জ ভিলা’ নামে পরিচিত একটি বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আব্দুস সাত্তারের বয়স ছিল ৯০ বছর, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের ৭৬ এবং গৃহকর্মী তাহমিনার বয়স ১৮ বছর।
একই পরিবারের গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা তরুণ গৃহকর্মীর এমন মৃত্যু সিলেটজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজনকে আটক করার কথা জানায়।
পুলিশের দাবি, রংমিস্ত্রির কাজ করা বাবুল মিয়ার সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনার সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকালে তাহমিনার সম্মতিতে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করেন বলে পুলিশের ভাষ্য। পরে দুজনের মধ্যে অনৈতিক প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁকেও আক্রমণ করা হয়। পরে তিনজনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান। পরে কাছাকাছি একটি ঝোপে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেওয়া হয় বলে পুলিশের দাবি। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাবুলকে আটক করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঝোপঝাড় থেকে ছুরিটি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার সন্ধ্যায় বাবুলকে আটকের পর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বাবুল ওই বাসায় রংমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে বাবুল বাসায় প্রবেশ করেন। পরে তাহমিনাকে নিয়ে একটি কক্ষে যাওয়ার পর তাঁদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন। তাঁর চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও আঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পুলিশের প্রাথমিকভাবে দেওয়া কারণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্নও উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ঘটনাটিকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। নিহত আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক বিরোধের বিষয়টিও স্থানীয়দের আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ বা সম্ভাব্য অন্য কোনো উদ্দেশ্য এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশও জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেটের একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ছিলেন বলেও জানা গেছে। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহল ও স্থানীয়দের মধ্যেও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের দেশে ফেরার অপেক্ষা চলছিল। প্রবাসে থাকা সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের এমন আকস্মিক মৃত্যু ছিল গভীর শোকের। বৃহস্পতিবার দুই মেয়ে দেশে ফেরার পর শুক্রবার একমাত্র ছেলেও দেশে পৌঁছেছেন। তাঁদের উপস্থিতিতেই আজ বাবা-মায়ের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে।
এদিকে গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ বৃহস্পতিবারই তাঁর গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে নিয়ে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে একই ঘটনার তিন নিহতের মধ্যে দুজনের দাফন শেষ হলেও আজ সম্পন্ন হবে প্রবীণ দম্পতির শেষ বিদায়।
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। আটক বাবুল মিয়া কারাগারে থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের পর তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। হত্যাকাণ্ডের কারণ, ব্যবহৃত অস্ত্র, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা করবে তদন্তকারী সংস্থা।
একই সঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের পর মামলার তদন্ত কোন দিকে এগোয়, সেটিও নজরে থাকবে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে যে কারণ উঠে এসেছে, আদালত ও তদন্তের পরবর্তী ধাপে তার সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্য কোনো কারণ বা ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় কি না, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
আজ শাহী ঈদগাহে বাবা-মায়ের জানাজায় অংশ নেবেন দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা সন্তানরা। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের উপস্থিতিতে শেষবারের মতো বিদায় জানানো হবে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমকে। এরপর নয়াসড়কের কবরস্থানে পাশাপাশি তাঁদের দাফন করা হবে। মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের অপেক্ষায় থাকবে পরিবার ও সিলেটবাসী।


