প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সিসিইউর একটি বেড দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত রাখার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অফিস আদেশের কপি প্রকাশের পর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষার।
তাঁর অভিযোগ, ড. ইউনূসের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য কার্ডিওলজি বিভাগের সিসিইউ-২-এর একটি বেড বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় সেটি সাধারণ রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। তবে ওই বেডটি পুরো ১৮ মাস ধরে বাস্তবে খালি ছিল কি না, কিংবা এই সময়ে কোনো জরুরি রোগীকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে কি না—এসব দাবির স্বাধীন ও আনুষ্ঠানিক যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে বিএসএমএমইউর কার্ডিওলজি বিভাগের একটি অফিস আদেশের কপি প্রকাশ করেন ডা. তুষার। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবরের ওই নথিতে ড. ইউনূসের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সিসিইউ-২, বেড-১-এ সার্বক্ষণিক বিশেষ ব্যবস্থার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, কার্ডিওলজি বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদের স্বাক্ষরে ওই কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যের কমিটিতে একজনকে সভাপতি এবং একজনকে সদস্যসচিব করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই অফিস আদেশ সামনে আসার পর বিতর্কের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে সিসিইউর ওই বেড। ডা. তুষার দাবি করেছেন, একজন ভিআইপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সিসিইউ বেড দীর্ঘ সময় সাধারণ রোগীদের নাগালের বাইরে রাখা হলে তা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রশ্ন তৈরি করে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, গড়ে একজন রোগী যদি এক সপ্তাহ সিসিইউ সেবা পান, তাহলে ১৮ মাসে ওই সময়ের মধ্যে বহু সংকটাপন্ন রোগী চিকিৎসার সুযোগ পেতে পারতেন। তাঁর অভিযোগ, বেডটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করার কারণে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত—বেডটি আসলেই পুরো সময় খালি ছিল কি না। একটি বেড কোনো ভিআইপির জন্য নির্ধারিত থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে সেটি ব্যবহার করা হয়েছে কি না, কিংবা রোগী না থাকলে অন্য রোগীকে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা হাসপাতালের সিসিইউ রেজিস্টার, ভর্তি নথি ও চিকিৎসা রেকর্ড যাচাই করলেই স্পষ্ট হতে পারে।
এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি।
বাংলাদেশের মতো দেশে বিশেষায়িত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য সিসিইউর একটি বেড অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে। ফলে কোনো বেড দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত ছিল কি না—এমন প্রশ্ন সামনে এলে তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়, স্বাস্থ্যসেবার ন্যায্যতা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একই সঙ্গে ভিআইপি বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুত রাখা নিজেই অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির হঠাৎ অসুস্থতার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য হাসপাতালগুলোতে বিশেষ মেডিকেল টিম বা জরুরি চিকিৎসা পরিকল্পনা থাকতে পারে। প্রশ্নটি তাই কেবল বিশেষ ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটি নয়; বরং সেই ব্যবস্থার পরিধি, সময়কাল এবং সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবায় তার কোনো বাস্তব প্রভাব পড়েছিল কি না—সেটিই মূল বিষয়।
ডা. তুষারের প্রকাশ করা নথিতে যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথা রয়েছে, সেটি ছিল মূলত জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতির অংশ। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট বেড সংরক্ষিত থাকার অভিযোগকে ঘিরে।
এদিকে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ওই বিশেষ ব্যবস্থা বহাল ছিল কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে। সরকারের দায়িত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো ব্যক্তির জন্য তৈরি বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের নথি ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রয়োজন।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ওই বেড খালি থাকার কারণে নির্দিষ্টসংখ্যক রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের দাবি করা হলেও কোনো রোগীর নাম, চিকিৎসা রেকর্ড বা হাসপাতালের পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, যা দিয়ে দাবিটির সরাসরি সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
তাই বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত বা হাসপাতালের রেজিস্টার পর্যালোচনা ছাড়া ‘কতজন রোগী বঞ্চিত হয়েছেন’—এমন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। একইভাবে, বেডটি সবসময় খালি ছিল—এমন দাবিও হাসপাতালের নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না।
তবে ঘটনাটি যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, তা হলো সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য সীমিত সিসিইউ সুবিধা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে। ভিআইপি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং সাধারণ রোগীদের সমান চিকিৎসার অধিকার—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যেকোনো আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একজন সাবেক সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই প্রস্তুতি যেন সাধারণ রোগীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ অযথা সংকুচিত না করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো নথি বা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথি যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ যদি ওই অফিস আদেশের প্রেক্ষাপট, বেডটির ব্যবহারসংক্রান্ত রেকর্ড এবং পরবর্তী সময়ে বিশেষ ব্যবস্থার কী হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে বিতর্কের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। বিশেষ করে বেডটি কতদিন সংরক্ষিত ছিল, ওই সময়ে কতদিন খালি ছিল এবং জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে এলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তিও কমবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ভিআইপি চিকিৎসা, হাসপাতালের সীমিত সম্পদের ব্যবহার এবং সাধারণ রোগীর অধিকার নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, জীবনরক্ষাকারী সিসিইউ শয্যার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যে জরুরি—এই ঘটনায় সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এসেছে।


