প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পুলিশ আটক বাবুল মিয়াকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দাবি করে ঘটনার নেপথ্যে ব্যক্তিগত বিরোধের কথা বললেও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো কারণ থাকতে পারে এবং তদন্তে সম্পত্তি বা জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১২ আগস্ট সকালে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার ‘মিতালী ১১১ নিকুঞ্জ ভিলা’য় তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ঘটনাটি সিলেটজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিহত আব্দুস সাত্তার ছিলেন প্রবীণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের বাসায় কর্মরত তরুণী তাহমিনাও একই ঘটনায় প্রাণ হারান। হত্যাকাণ্ডের দিনই বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত একটি ছোরা উদ্ধারের কথা জানানো হয়। বৃহস্পতিবার তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি এখন সামনে আসছে স্থানীয়দের বিভিন্ন প্রশ্ন। মিতালী আবাসিক এলাকার সমাজকল্যাণ সমিতির সহসভাপতি নুরুল ইসলাম মনে করেন, ঘটনাটিকে কেবল ব্যক্তিগত বা প্রেমঘটিত বিরোধ হিসেবে দেখলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিক বাদ পড়ে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্য, তাহমিনা হত্যার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ওই বাসায় কাজে এসেছিলেন। এত অল্প সময়ে একটি সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এ ব্যাখ্যা তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।
স্থানীয়দের এমন সংশয়ের পেছনে আরও কিছু বিষয় কাজ করছে। মিতালী আবাসিক এলাকার সমাজকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক নাজুসহ কয়েকজন বাসিন্দা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি হত্যাকাণ্ডের কারণ কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ হয়ে থাকে, তাহলে বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা থাকার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। তাঁরা একই সঙ্গে নিহত আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি ও জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এ ধরনের প্রশ্ন ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
পুলিশ অবশ্য এখন পর্যন্ত বাবুল মিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টিকেই তদন্তের অন্যতম প্রধান সূত্র হিসেবে দেখছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুল রংমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডের একটি সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করেছে পুলিশ। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে হত্যার কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কথা-কাটাকাটি কিংবা গালিগালাজের মতো ভিন্ন ভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
এসএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাবুল মিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে রায়নগরের একটি খালি জায়গা থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণে বাবুলের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে একই সঙ্গে তদন্তকারীরা বলছেন, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এখানেই তদন্তের স্বচ্ছতা ও ফরেনসিক প্রমাণের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। স্থানীয়দের কেউ কেউ সিসিটিভি ফুটেজের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ফুটেজে বাবুলকে সকাল ৯টা ২২ মিনিটে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে, অথচ বাসার ভেতর থেকে চিৎকার শোনার সময় হিসেবে প্রায় ৯টা ২৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের কথা বলা হচ্ছে। এই সময়ের ব্যবধানের ব্যাখ্যা কী—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে সিসিটিভির সময়, অডিওর উৎস এবং ঘটনাস্থলের সঙ্গে ফুটেজের সম্পর্ক ফরেনসিকভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিও স্থানীয়দের আলোচনায় এসেছে। তাঁদের দাবি, বুধবার রাতে যে স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছিল, সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি; পরদিন একই এলাকা থেকে ছোরা উদ্ধারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন পুনরায় তল্লাশি চালানো হয় এবং সেখান থেকেই অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে। ফলে অস্ত্রটির অবস্থান, উদ্ধার প্রক্রিয়া এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিহত আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক বিরোধ। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন এবং একসময় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তাঁর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কথাও আলোচিত হচ্ছে। কিছু প্রতিবেদনে আদালতে চলমান একটি জমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে তাঁর পূর্ববিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব তথ্যের সত্যতা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়ার কথা।
হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও প্রকাশ পেয়েছে। বৃহস্পতিবার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মিতালী আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতি ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডবাসীর উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারী এবং নেপথ্যের কারণ শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্যে মূল উদ্বেগ ছিল—একজন ব্যক্তি একাই এত অল্প সময়ে তিনজনকে হত্যা করতে পেরেছেন কি না এবং পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যার বাইরে আর কোনো সূত্র আছে কি না।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে কোনো একটি সম্ভাবনাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বাবুল মিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, তাঁর দেওয়া তথ্য, অস্ত্র উদ্ধার, সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল—সবকিছুকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই হবে তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে স্থানীয়দের উত্থাপিত সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ বা অন্য কোনো সম্ভাব্য উদ্দেশ্যের বিষয়ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিহত পরিবারের সদস্যদের জন্য এই ঘটনা আরও গভীর শোকের। আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের সন্তানদের কয়েকজন দেশের বাইরে বসবাস করেন। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে তাঁদের সন্তানরা সিলেটে ফিরতে শুরু করেছেন। দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি পরিবারের এমন আকস্মিক ও নৃশংস পরিণতি স্থানীয়দের মধ্যেও নিরাপত্তা ও বিচার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে রায়নগরের এই ট্রিপল মার্ডার এখন কেবল তিনটি প্রাণহানির তদন্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, বাবুল মিয়া একাই জড়িত কি না, ব্যক্তিগত বিরোধের দাবির পেছনে কতটা প্রমাণ রয়েছে, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের কোনো ভূমিকা ছিল কি না এবং ঘটনাস্থলের সব আলামত কী বলছে—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।
পুলিশ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে বাবুল মিয়ার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলেও অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা পক্ষ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তে দেখা হচ্ছে। ফলে তদন্ত যত এগোবে, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে নতুন কোনো তথ্য যুক্ত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুমান বা জনশ্রুতির বদলে প্রমাণনির্ভর তদন্ত। কারণ একটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে শুধু একজনকে আটক করাই শেষ কথা নয়; কেন হত্যা হলো, কীভাবে হলো এবং এর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর কেউ ছিল কি না—প্রতিটি প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর প্রয়োজন। সিলেটের এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডেও সেই পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় এখন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় মানুষ।


