সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারায় ভাঙন, আতঙ্কে দুই উপজেলার মানুষ

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী জনবহুল দুই উপজেলা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জকে ঘিরে নদীমাতৃক অঞ্চলের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে এক নীরব আর্তনাদ। এই দুটি উপজেলা নিয়েই গঠিত জাতীয় সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-৫ আসন। উভয় উপজেলার বুক চিরে সর্পিল গতিতে বয়ে চলেছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। যে নদী একসময় এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য ও আনন্দের অংশ ছিল, সময়ের ব্যবধানে তা আজ সীমাহীন দুর্ভোগ ও সর্বনাশের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকাল শুরু হলেই নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রমত্তা রূপ ধারণ করে সুরমা ও কুশিয়ারা, যার ফলে দেখা দেয় ভয়াবহ ও গ্রাসী নদীভাঙন। নাব্যতা সংকট, নদীর বুকে তীব্র স্রোত এবং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে শত শত পরিবার তাদের বাপ-দাদার বসতভিটা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে।
নদীর উৎপত্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের বরাক নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী আমলশীদ পয়েন্টে এসে নদীটি দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়েছে। যার একটি শাখা সুরমা এবং অপরটি কুশিয়ারা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ হয়ে পুরো সিলেট জেলার ওপর দিয়ে প্রবহমান রয়েছে। কিন্তু নদীর এই স্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রবাহ এখন সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক ভূপ্রকৃতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সীমারেখাও বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত বা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও জনপ্রতিনিধিরা।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের তাণ্ডব চললেও কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দুই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের শত শত একর উর্বর ফসলি জমি, বসতভিটা, রাস্তাঘাট, স্কুল, মসজিদ ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে। নদীভাঙনের পুরনো ক্ষত পুরোপুরি শুকানোর আগেই সম্প্রতি সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, এই পরিস্থিতি যেন তাদের কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো যন্ত্রণাদায়ক। প্রতিদিন নদীর বুক ভেঙে গ্রাস করে নিচ্ছে জনপদের পর জনপদ, আর সর্বগ্রাসী এই ভাঙনের ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নদীপারের হাজার হাজার মানুষ।
কানাইঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোসাইনপুর গ্রাম বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অন্যতম। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে নদীভাঙনের ভয়াবহ রূপ দেখা দিয়েছে। ইতিপূর্বেও এই এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার সেগুলোকে অন্য স্থানে বা পুনর্নির্মাণ করলেও বর্তমানে নতুন করে শুরু হওয়া ভাঙনের মুখে সেগুলো আবারও চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের খুলুরমাটি ও জিতপুর গ্রাম, নয়াগ্রাম, পৌরসভার ডালাইচর, বায়মপুর, সাতবাক ইউনিয়নের চরিপাড়া এবং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের উজান বারাফৈইত এলাকায়ও সুরমা নদীর ভাঙন নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন নদীর ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না দেখায় চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই জনপদের সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে জকিগঞ্জ উপজেলার পরিস্থিতিও সমানভাবে উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক। উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী জকিগঞ্জ বাজার এলাকায় নদীভাঙনের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এছাড়া লালগ্রাম, ভাখরশাল, পৌরসভার বাজার এলাকা, মাইজকান্দি গ্রাম এবং বীরশ্রী ইউনিয়নের পীরনগর, পিয়াইপুর ও মাঝরগ্রাম এলাকায়ও নতুন করে নদীভাঙনের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে এই জনপদগুলোর ব্যাপক অংশ মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। নদীর পাড়ে বসবাস করা মানুষগুলোর কাছে এখন জীবনযাপন করা মানেই প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ের সঙ্গে লড়াই করা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বুক কাঁপতে থাকে এই আশঙ্কায় যে, কখন প্রমত্তা নদী তাদের শেষ সম্বলটুকু গ্রাস করে নেবে।
জকিগঞ্জ প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ কে এম মামুন সংবাদমাধ্যমকে জানান, কুশিয়ারা নদীর অব্যাহত ও নির্মম ভাঙনে জকিগঞ্জ উপজেলার অসংখ্য গ্রাম, জনপদ, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, যোগাযোগ সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে সুলতানপুর ইউনিয়ন, বারঠাকুরি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বাজারসংলগ্ন এলাকাসহ একাধিক স্থানে ভয়াবহ ভাঙন জনজীবনকে বিপর্যয়কর করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদী এই ভাঙনের কারণে জকিগঞ্জের ভৌগোলিক সীমানাতেও পরিবর্তন এসেছে। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সদর ইউনিয়নের গোসাইনপুর গ্রামের বাসিন্দা লোকমান উদ্দিন বলেন, সুরমা নদীর ডাইকে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে ডাইকটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে, যার পাশেই নবনির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিকটি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভাঙনকবলিত এলাকার চরম দুর্দশাগ্রস্ত বাসিন্দারা সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তবে এই হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রা। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভয়াবহ ভাঙন চিরতরে রোধ করতে প্রায় এক হাজার ২৭৩ কোটি টাকার একটি বৃহৎ ও ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীপারের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যাটির একটি স্থায়ী সমাধান হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের করুণ চিত্র জোরালোভাবে তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার সেই দাবির প্রেক্ষিতে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। এ বিষয়ে সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান বলেন, সুরমা ও কুশিয়ারার একাধিক ভয়াবহ ভাঙনকবলিত এলাকা আমি নিজে পরিদর্শন করেছি এবং স্থানীয় মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের বিষয়টি পানি সম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সরকার জনদুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সরকারের গৃহীত স্থায়ী সমাধানের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীপারের হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে এবং জনজীবন স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

নতুন ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিলে প্রতিহত করা হবে: ছাত্র জমিয়ত

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন: অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে কূটনীতি

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি...

বিয়ানীবাজারে ১৬ শ পিস ইয়াবাসহ কুখ্যাত মাদক কারবারি আটক

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সিলেটের সড়ক দুর্ঘটনায় জনপ্রিয় বাউল শিল্পী পেহেলী ভৈরবী নিহত

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ: হবিগঞ্জে পদচ্যুত জামায়াত নেতা

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

নতুন ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিলে প্রতিহত করা হবে: ছাত্র জমিয়ত

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিয়ানীবাজারে ১৬ শ পিস ইয়াবাসহ কুখ্যাত মাদক কারবারি আটক

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সিলেটের সড়ক দুর্ঘটনায় জনপ্রিয় বাউল শিল্পী পেহেলী ভৈরবী নিহত

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ: হবিগঞ্জে পদচ্যুত জামায়াত নেতা

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

এম ইলিয়াস আলীকে ‘দ্বিতীয় চেষ্টায়’ অপহরণ, নেতৃত্বে জিয়া

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ