প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব দিন দিন আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও এই মারাত্মক ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই ভয়াল রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও দুটি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। একই সময়ে নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও প্রায় শতাধিক শিশু। এমন একটি সংকটময় পরিস্থিতিতে পুরো সিলেটজুড়ে অভিভাবক ও সচেতন মহলে গভীর উৎকণ্ঠা এবং ভয়ের ছায়া নেমে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হামে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৭৮৮ জনে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় বিভাগজুড়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। সামান্য জ্বর ও সর্দি-কাশি থেকে শুরু হওয়া এই রোগটি দ্রুত রূপ নিচ্ছে জটিল নিউমোনিয়া বা অন্যান্য মারাত্মক শারীরিক জটিলতায়, যা শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া দুটি শিশুর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে একজন সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা ইয়ামিন, যার বয়স ছিল মাত্র এক বছর পাঁচ মাস। অপর শিশুটি হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার বাসিন্দা আনিসা, যার বয়স মাত্র আট মাস। এই অবুঝ শিশু দুটি সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও রোগের তীব্রতা এবং শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতির কারণে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সন্তান হারা পিতা-মাতার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ২৯৪ জন শিশু। এর মধ্যে কেবল ডেডিকেটেড শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন আছেন ১১৯ জন শিশু। এছাড়া সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৭ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। শহর ছাড়িয়ে মফস্বল এলাকাতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৩৬ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২ জন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২৫ জন শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত টিকা গ্রহণের অভাবে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা শিশুদের মধ্যে মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। অসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে টিকাদান নিশ্চিত না করার কারণেই এই প্রাদুর্ভাব বারবার রূপ নিচ্ছে মহামারীতে। অনেক পরিবার প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে অবহেলা করেন, যার ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করার পর হাসপাতালে আনা হয় এবং চিকিৎসকদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদানের শতভাগ নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসাকর্মীদের। অনেক হাসপাতালেই শয্যা সংকটের কারণে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে ছোট ছোট শিশুদের। অভিভাবকরা সন্তানের জীবন বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সিলেটের এই সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং হামের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধ করতে টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। আর কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয়, সে জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জোর দাবি উঠেছে সব মহল থেকে।


