প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ দেড় দশক আগের এক আলোচিত রাজনৈতিক রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। বিএনপির তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা ও সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীকে গুম করার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফার সুপরিকল্পিত চেষ্টায় তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই পুরো অপহরণ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এই নিখোঁজের ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর বনানী এলাকার আমতলী থেকে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ইলিয়াস আলী সে সময় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ভারতের প্রস্তাবিত বিতর্কিত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ২০০৯ সালে টিপাইমুখ বাঁধের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সিলেট অঞ্চলে যে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে তিনি সম্মুখসারির ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার এই রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সরকারের কঠোর সমালোচনার কারণে নানা মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
বিএনপি এবং নিখোঁজ নেতার পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই অভিযোগ করা হচ্ছিল যে, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও নির্দেশেই তাকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পরিবারটি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, এই চাঞ্চল্যকর অপহরণ মামলায় সেনা হেফাজতে থাকা বিমান বাহিনীর তৎকালীন উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে। আগামী রোববার এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে আনুষ্ঠানিক আদেশ আসার কথা রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ওই ঘটনার সময় স্কোয়াড্রন লিডার সাইফুর রহমান র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন এবং তার তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান ছিলেন র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক। পরবর্তীতে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জিয়াউল আহসানকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তিনি মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অন্যদিকে, উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের জামাতা এবং বিমান সদর দপ্তরের ডিরেক্টরেট অব এয়ার ট্রেনিংয়ে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গত ২১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনার এক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েসের জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীর গুম ও হত্যার ঘটনায় সাইফুর রহমানের নাম জোরালোভাবে উঠে আসে। এরপর ২৬ জুলাই রাতে বিশেষ সামরিক পুলিশ শাখা (প্রভোস্ট) তার বাসা থেকে তাকে আটক করে এবং পরে বাহিনীর বিশেষ সেলে হেফাজতে রাখে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক তদন্ত এবং সাক্ষীর জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীকে অপহরণের ঘটনায় উইং কমান্ডার সাইফুরের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদসহ এই ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতেও নিবিড় তদন্ত চলছে।
বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় ইমরুল কায়েস নিজেকে জিয়াউলের সাবেক রানার হিসেবে পরিচয় দেন। তার সেই জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীকে গুম করার পেছনের রোমহর্ষক বিবরণ উঠে আসে। ইমরুল আদালতকে জানান, ২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার্স থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার এবং স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ তারা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকটবর্তী এলাকায় গিয়েছিলেন। সে সময় কাকে তুলে নেওয়া হবে তা তার জানা ছিল না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বারবার বিভিন্ন নম্বরে ফোন করে জানার চেষ্টা করছিলেন যে তাদের নির্দিষ্ট টার্গেট কখন আসবে। তবে একটি পর্যায়ে খবর আসে যে সেই দিন আর টার্গেট আসছে না।
এরপর সেখান থেকে জিয়াউল আহসানকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে সাক্ষী জানান যে, ঘটনার পর দিনই তিনি নয় দিনের ছুটিতে নিজ বাড়িতে চলে যান। ছুটির মধ্যে মিডিয়ার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে মহাখালী ওভারব্রিজের কাছ থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহৃত হয়েছেন। ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল কর্মস্থলে ফিরে তিনি র্যাব হেডকোয়ার্টার্সে এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিবেশ দেখতে পান। ঘটনার সমস্ত প্রমাণ ও আলামত নষ্ট করে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্ট্রার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নিজ হাতে ধ্বংস করে দেন। সাধারণত সকাল ৯টায় ফলার বা প্যারেড অনুষ্ঠিত হলেও ১৮ এপ্রিল থেকে তা পরিবর্তন করে সকাল ৭টায় নির্ধারণ করা হয় এবং জিয়া স্যার নিজেই টানা কয়েক দিন সেই প্যারেডে উপস্থিত ছিলেন।
চলতি বছরের ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সরকারের এক নীতিপ্রণেতা পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমের খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি করেন যে, ইলিয়াস আলীকে বনানী থেকে তুলে সরাসরি র্যাব-১ সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরে তার লাশ ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। সাক্ষীর জবানবন্দিতে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর টেলিফোন কথোপকথনের প্রসঙ্গ এসেছে, যা এই গুমের ঘটনার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। সবমিলিয়ে দেড় দশক আগের এই লোমহর্ষক গুমের ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন।


