প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সিলেট ও এর আশপাশের এলাকা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় দুটি দূরপাল্লার বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন আটজন। পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ত্রিশজন যাত্রী, যাদের অনেকেই মৃত্যুর সঙ্গে লঙ্কার লড়ছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায়। আনন্দমুখর একটি দিন বা স্বাভাবিক একটি সকাল মুহূর্তেই রূপ নেয় দীর্ঘশ্বাসে ও আর্তনাদে, যা পুরো দেশবাসীকে শোকাহত করেছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সিলেট অভিমুখী ও ঢাকামুখী দুটি যাত্রীবাহী বাস ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর বাজার সংলগ্ন কাশিকাপন এলাকায় পৌঁছায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ইউনিক পরিবহন এবং বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষটি এতটাই আকস্মিক ও শক্তিশালী ছিল যে ইউনিক পরিবহন নামের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের গভীর খাদে সজোরে গিয়ে পড়ে। বাসের ভেতরের যাত্রীদের আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশের শান্ত পরিবেশ। মুহূর্তের মধ্যে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ভেতরে আটকা পড়েন অনেক যাত্রী।
খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হাইওয়ে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। স্থানীয় উৎসুক ও মানবিক জনতাও উদ্ধারের কাজে এগিয়ে আসেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টায় বাসটির ভেতর থেকে একে একে যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। তবে ততক্ষণে ঘটনাস্থলেই চিরনিদ্রায় তলিয়ে গেছেন আটজন দুর্ভাগ্যবান মানুষ। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালান আহতদের প্রাণ বাঁচাতে, কিন্তু মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত এক শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে সেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
দুর্ঘটনার পর পরই নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রশাসনের তৎপরতায় নিহতের তালিকায় থাকা চারজনের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার বাসিন্দা উত্তম রায়ের পুত্র সপ্তম রায় প্রীতম, যার বয়স মাত্র বাইশ বছর। পরিবারের একমাত্র কিংবা আদরের সন্তানকে হারিয়ে তার স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল চত্বর। এছাড়া নিহতদের তালিকায় রয়েছে ঢাকার বিক্রমপুর এলাকার জাহাঙ্গীর শেখের মাত্র তিন বছর বয়সী শিশুকন্যা খোজাইফা, যার অবুঝ মুখটি চিরতরে মুন্দ হয়ে গেছে সড়ক দুর্ঘটনার নির্মম শিকারে। নিহতদের অন্য দুজনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তাদের একজন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার পরিচিত ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম এবং অন্যজন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার বাসিন্দা পেহেলি ভৈরবী। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিরা মূলত ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোরশেদুল আলম ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে জানান, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে দয়ামীর বাজারের পাশের কাশিকাপন নামক স্থানে বেঙ্গল বাস এবং ইউনিক বাসের মুখোমুখি এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতার কারণে ইউনিক বাসটি সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। তিনি আরও জানান, দুই বাসেরই বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন এবং তাদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
এদিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির সংবাদমাধ্যমকে জানান, হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় একটি শিশু মারা গেছে যার মাথায় মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকদের বিশেষ দল তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা প্রদান করছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসা স্বজনদের আহাজারিতে পুরো হাসপাতাল এলাকার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না যে সকালের একটি সাধারণ যাত্রা এভাবে চিরতরে কেড়ে নিয়েছে তাদের আপনজনকে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা নতুন করে সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত ওভারটেকিং প্রবণতা এবং দূরপাল্লার বাসগুলোর বেপরোয়া চালনার কারণে প্রায়শই এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সচেতন মহলের মতে, চালকদের অসাবধানতা এবং ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে বারবার প্রিয়া হারাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। মহাসড়কে এমন দুর্ঘটনা রোধ করতে দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য এই শোক কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব এক যন্ত্রণার নাম। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে প্রার্থনা, আর শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো সিলেটজুড়ে।


