প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট জেলার প্রশাসনিক হাল ধরার কথা ছিল যাঁর, সেই নবাগত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মু. রেজা হাসান শেষ মুহূর্তে ফিরে গেলেন সচিবালয়ের পথে। ঢাকা থেকে সিলেটের আকাশপথের যাত্রায় বের হয়েও বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে ডাক পেলেন উচ্চপর্যায়ের। ফলে তাঁর সিলেটে পদায়ন এবং দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা। সরকারের মাঠ প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় কর্মস্থল হিসেবে পরিচিত সিলেটে জেলা প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটেছে, তা স্থানীয় প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও নানা গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে। মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ এই পদটি ঘিরে যেন পর্দার আড়ালে এক রুদ্ধশ্বাস স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে প্রশাসনিক স্বাভাবিক কার্যক্রমে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ জুন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-২ শাখা থেকে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে কুমিল্লার ডিসি মো. রেজা হাসানকে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি করা হয়। একই আদেশে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রোজী আক্তারকে কুমিল্লার নতুন ডিসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বুধবার কুমিল্লার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে রেজা হাসানের সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। তিনি কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান এবং দুপুর ১টার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য বিমানবন্দরের গেটে উপস্থিত হন। একদিকে সিলেটে তাঁকে স্বাগত জানাতে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তখন অপেক্ষা করছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা, অন্যদিকে প্রস্তুত ছিল জেলা প্রশাসকের সরকারি গাড়ি।
কিন্তু রেজা হাসান যখন বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই অন্তিম মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকারের বিশেষ নির্দেশনায় তাঁর সিলেটযাত্রা স্থগিত করা হয়। তাঁকে জরুরিভিত্তিতে সচিবালয়ে তলব করা হয়। বিমানবন্দর থেকে বিমানে আর না চড়ে তিনি তৎক্ষণাৎ সচিবালয়ের দিকে পা বাড়ান। বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ সিলেট জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুপুর দেড়টার দিকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অনিশ্চয়তার খবর জানতে পারেন এবং দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর বিফল মনোরথে ফিরে আসেন। এই ঘটনাটি সিলেটের প্রশাসনিক অন্দরমহলে বড় ধরনের অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রজ্ঞাপন হওয়ার পরও একজন ডিসিকে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা সরকারি আমলাতন্ত্রে খুব একটা সচরাচর দেখা যায় না, যা এই পদায়নের পেছনের কোনো গভীর রহস্যের দিকে আঙুল তুলছে।
প্রশাসনিক ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সিলেট জেলা কেবল প্রবাসী অধ্যুষিতই নয়, বরং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ প্রশাসনের আমলাদের কাছে সিলেট ডিসি পদটি সবসময়ই ‘লোভনীয়’ কর্মস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সিলেট ডিসি পদের জন্য সরকারের উচ্চমহলে একাধিক আমলার জোর লবিং শুরু হয়েছিল বলে জানা গেছে। শোনা যাচ্ছে, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের নিজস্ব পছন্দের তালিকাও ওপর মহলে পাঠানো হয়েছিল। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক এই জটিল সমীকরণের কারণেই মূলত রেজা হাসানের নিয়োগটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু রেজা হাসানই নন, কুমিল্লায় নতুন ডিসি হিসেবে যোগদান করা রোজী আক্তারকে নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যা পুরো বদলি প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এই পরিস্থিতির ফলে সিলেট জেলা প্রশাসনের কাজে স্থবিরতা আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আলোচিত-সমালোচিত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের পর সিলেটে একজন স্থিতিশীল প্রশাসন দরকার ছিল। কিন্তু রেজা হাসানের যোগদান নিয়ে এই অনিশ্চয়তা কেবল প্রশাসনিক জটিলতাই বাড়াচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা প্রশ্নের উদ্রেক করছে। ডিসি কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় নেতারা এখন জানতে চান, সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় কে আসছেন এবং কেন এই লুকোচুরি। প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এভাবে শেষ মুহূর্তে ডিসি পরিবর্তন বা আটকে দেওয়ার ঘটনা মাঠ প্রশাসনের মনোবল কমিয়ে দেয় এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে।
অনেকেই ধারণা করছেন, এই পদায়নের পেছনে কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ কাজ করছে। সরকারের উচ্চমহল এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন করে হয়তো অন্য কোনো প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিলেটের জন্য ডিসি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে সেটি কখন হবে বা রেজা হাসানই শেষ পর্যন্ত যোগ দেবেন কি না, তা এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। এই ঘটনাটি আমলাতন্ত্রের ভেতরে ‘তদবির সংস্কৃতি’ কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে, তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। যেখানে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা, সেখানে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীতান্ত্রিক পছন্দের প্রভাব প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে ম্লান করে দিচ্ছে।
সিলেটের মানুষ এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে সরকারি পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। উন্নয়নের স্বার্থে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সিলেটে একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য জেলা প্রশাসকের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ঘনঘন প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন এবং এভাবে ডিসি পদ নিয়ে নাটকীয়তা কেবল প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং উন্নয়নমূলক কাজগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নবাগত ডিসির এই ফিরে যাওয়া কেবল একটি ব্যক্তির যাত্রাভঙ্গ নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক দুর্বল মুহূর্তের বহিঃপ্রকাশ। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না করলে সিলেটে প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিতে পারে, যা কাম্য নয়।

