প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মাত্র পাঁচশ টাকার জন্য একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা কতটা নৃশংস হতে পারে, তার এক মর্মান্তিক নজির তৈরি হলো সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে। একটি পুরোনো মোবাইল ফোনের বকেয়া টাকা পরিশোধের বিবাদকে কেন্দ্র করে জয় মহাপাত্র নামের ২০ বছর বয়সী এক যুবককে বিষপানে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত আমিরুল ইসলামকে দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে র্যাব। শুক্রবার সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ এলাকায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-৯ এর বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয় এই খুনি। শনিবার দুপুরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং মানুষের সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের একটি দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। নিহত জয় মহাপাত্রের সাথে আমিরুল ইসলামের একটি পুরোনো মোবাইল কেনাবেচার চুক্তি হয়। পাঁচ হাজার পাঁচশ টাকায় নির্ধারিত সেই ফোনের জন্য জয় পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করেছিলেন এবং বাকি পাঁচশ টাকা পরে দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বছরের ৮ জানুয়ারি সকালে দিরাই উপজেলার ভাঙ্গাডহর এলাকার একটি কালভার্টের পাশে আমিরুলের সঙ্গে জয়ের দেখা হলে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। জয় তাৎক্ষণিক বাকি পাঁচশ টাকা দিতে না পারায় আমিরুল অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেন। এমনকি মোবাইলটি কেড়ে নিয়ে তিনি জয়কে নির্দেশ দেন যেন বিকেলে তার দোকানে গিয়ে সিম কার্ডটি নিয়ে আসে। এই তুচ্ছ ঘটনাটিই যে জয়ের জীবনের শেষ দিনে পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বিকেলে সরল বিশ্বাসে জয় যখন আমিরুলের দোকানে তার সিম কার্ডটি ফেরত নিতে যায়, তখন সেখানে অন্য এক অন্ধকার পরিকল্পনা অপেক্ষা করছিল। দোকানে প্রবেশের পরপরই আমিরুল ভেতর থেকে দরজা আটকে ফেলে। জয়কে ঘিরে ফেলে শুরু হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। সবশেষে চরম নৃশংসতার পরিচয় দিয়ে আমিরুল একটি গ্লাসে পানি ও বিষ মিশিয়ে জোরপূর্বক জয়ের গলায় ঢেলে দেয়। বিষপানের পর আমিরুল তাকে সিম কার্ডটি দিয়ে দ্রুত বাড়ি চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। বাড়ি ফেরার পর থেকেই জয় ঘনঘন বমি করতে শুরু করলে পরিবারের সদস্যরা ভয় পেয়ে তাকে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ৯ জানুয়ারি জয় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ছেলের অকাল ও নৃশংস মৃত্যুতে জয়ের মা বাদী হয়ে দিরাই থানায় আমিরুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই খুনি আমিরুল পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল। তবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ এলাকায় তার অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তীতে র্যাব-৯ এর সিপিসি-৩ এবং সদর কোম্পানির যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানোর মধ্য দিয়ে মামলার আইনি কার্যক্রম এখন নতুন মোড় নিল।
এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। মাত্র পাঁচশ টাকার জন্য একজন তরুণ প্রাণ হারালো, যা আধুনিক সভ্য সমাজে কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা এবং নৈতিকতা চর্চার অভাব বাড়ার কারণেই এই ধরনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে খুনের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে। তরুণ প্রজন্মের জয় মহাপাত্রের এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল তার পরিবারকেই ধ্বংস করেনি, বরং গোটা সমাজকে এক গভীর বার্তা দিয়ে গেল। মানুষের জীবন এখন কতটা অনিরাপদ তা এই ক্ষুদ্র বিবাদ থেকে বড় ট্র্যাজেডি তৈরির ঘটনাটি প্রমাণ করে।
র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আমিরুল ইসলাম সুনামগঞ্জের দিরাই থানাধীন বুরহানপুর গ্রামের মৃত হাজী মদরিছ মিয়ার ছেলে। গ্রেপ্তারের পর সে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধের বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হত্যা মামলার আসামি হিসেবে তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার জন্য পুলিশ ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। জয়ের পরিবারের সদস্যরা এখন বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। তারা চান, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন দ্রুত সম্পন্ন হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো জ জয়ের মতো প্রাণ অকালে ঝরে না যায়।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে এখন প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং বিবাদ নিরসনে আইনের পথে চলার শিক্ষা। জয়ের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল সম্ভাবনায় ভরা, কিন্তু একটি মোবাইলের সিম কার্ড ফেরত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার জন্য অভিশপ্ত হয়ে দাঁড়াল। এই বিচার যেন দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে না পড়ে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগই পারে জয়ের পরিবারকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দিতে। মানুষ যেন বুঝতে শেখে, একটি মানুষের জীবনের মূল্য কোনোভাবেই কয়েকশ বা কয়েক হাজার টাকার চেয়ে কম নয়। এই বিচারের বাণী যেন প্রতিটি অপরাধীর কানে পৌঁছে যায়, যাতে আর কোনো আমিরুল ইসলামের জন্ম না হয়। অপরাধের এই অন্ধকার জগত থেকে বেরিয়ে এসে আমরা যেন একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, সেই প্রত্যাশাই এখন সচেতন মহলের।


