প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসী যুবকের মরদেহ দেশে ফিরছে বিশেষ ফ্লাইটে। কাতারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো এই পাঁচ তরুণের মরদেহ মঙ্গলবার সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখতে অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা। অন্যদিকে, স্বজন হারানোর বেদনায় কানাইঘাটজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সোমবার রাতে কাতার থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে মরদেহগুলো বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে মরদেহগুলো সিলেট বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। মরদেহ গ্রহণের জন্য নিহতদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন।
ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহতদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেন, এই দুর্ঘটনায় কানাইঘাটের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। নিহতদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সার্বিক সহযোগিতা করছেন।
জানা গেছে, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা আবুল হাসানও বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই নিহতদের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সবকিছু স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হলে মঙ্গলবার যোহরের নামাজের পর দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের আকুনি মাদরাসা মাঠে নিহত পাঁচ প্রবাসীর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাদের নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হবে।
গত রবিবার কাতারের শাহানিয়া এলাকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। দুর্ঘটনার খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই কানাইঘাটের বিভিন্ন এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের ছেলে জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন, আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ, একই গ্রামের মৃত মড়া মিয়ার ছেলে জুবায়ের আহমদ এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ী গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদের আহমদ।
প্রবাসজীবনে থাকা এসব তরুণ পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন। অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তারা। তাদের আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, পুরো এলাকার মানুষ শোকাহত হয়ে পড়েছেন।
নিহতদের স্বজনরা জানান, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে তারা কাতারে পাড়ি দিয়েছিলেন। পরিবারের জন্য ভালো জীবন নিশ্চিত করতে দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবন। এখন পরিবারগুলো অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার।
প্রবাসীদের এমন অকাল মৃত্যু নতুন করে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিনিয়ত জীবিকার তাগিদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশি কর্মীরা নানা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে অনেকেই অকালে প্রাণ হারান। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কানাইঘাটের বহু পরিবার প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই উপজেলার অসংখ্য মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। তাই প্রবাসীদের কোনো দুর্ঘটনার খবর এলেই পুরো এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
কাতারে নিহত পাঁচ তরুণের মরদেহ দেশে ফেরার খবরে একদিকে যেমন স্বজনরা শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে পুরো কানাইঘাটবাসী তাদের জন্য দোয়া করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। পরিবারগুলোর এই কঠিন সময়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসী কর্মীদের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কাতারের মাটিতে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা এখন কানাইঘাটের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়ে পাঁচ পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করছেন শেষবারের মতো আপনজনকে গ্রহণ করার জন্য। মঙ্গলবার জানাজা ও দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে তাদের জীবনের এক অধ্যায়, তবে স্বজনদের স্মৃতিতে তারা বেঁচে থাকবেন আজীবন।


