প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই কিশোর-তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার (২৮ জুন) বিকেলে হবিগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল আঞ্চলিক সড়কের সাতগাঁও চা কন্যা ভাস্কর্যের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় নিহত দুই তরুণের পরিবার ও এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহতরা হলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের রমজান মিয়ার ছেলে সৌরভ (১৭) এবং একই গ্রামের তাজুল ইসলামের ছেলে নাঈম (১৭)। আহত ব্যক্তির নাম সাব্বির (২৫)। তিনি একই এলাকার শহিদ আলীর ছেলে। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় মোটরসাইকেলে তিনজন একসঙ্গে শ্রীমঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলেন।
হাইওয়ে পুলিশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে হবিগঞ্জ থেকে শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে রওনা দেন তিন আরোহী। পথিমধ্যে সাতগাঁও চা কন্যা ভাস্কর্যের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা হানিফ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলটির সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং তিন আরোহী গুরুতর আহত হয়ে সড়কে ছিটকে পড়েন।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন দ্রুত উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। আহতদের উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সৌরভ ও নাঈমকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত সাব্বিরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. নাভিদ রাইয়ান বিন শহিদ জানান, হাসপাতালে আনার আগেই দুই তরুণের মৃত্যু হয়েছিল। আহত অপর ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। প্রিয়জনের মরদেহ দেখে স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। অল্প বয়সে দুই তরুণের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকাবাসীর মধ্যেও গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশীরা জানান, সৌরভ ও নাঈম দুজনই প্রাণবন্ত ও পরিচিত মুখ ছিলেন। তাদের আকস্মিক মৃত্যু পরিবার ও এলাকাবাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
শ্রীমঙ্গল সাতগাঁও হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন রহমান জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুর্ঘটনার পর বাসের চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিক আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেলটিও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অনীহা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। একই সঙ্গে ভারী যানবাহন ও মোটরসাইকেলের মধ্যে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঝুঁকি তুলনামূলক অনেক বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ এবং মহাসড়কে কার্যকর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে তরুণ মোটরসাইকেল আরোহীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নির্ধারিত গতিসীমা অনুসরণ করা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হবিগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কের কিছু অংশে যানবাহনের উচ্চগতি এবং অসতর্ক চালনার কারণে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। তারা এই সড়কে আরও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানান।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রতিটি ঘটনাই একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। শ্রীমঙ্গলের এই দুর্ঘটনাও আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালক, যাত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

