প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব এবং হাম-সদৃশ উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সর্বশেষ সুনামগঞ্জের সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু নতুন করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৮১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪ জন এবং বাকি ৭৭ জন হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসর্গের ভিত্তিতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় মোট ৩৬০ জনের শরীরে হাম ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী সুনামগঞ্জ জেলায়, যেখানে ২১০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এরপর রয়েছে সিলেট জেলা, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১১৭। হবিগঞ্জে ৩৪ জনের মধ্যে ২ জনের শরীরে একই সঙ্গে রুবেলা ভাইরাসও শনাক্ত হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুইজনের নমুনা পরীক্ষায় হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৭৪ জন সন্দেহভাজন রোগী বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৯০ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সর্বাধিক ৯৭ জন ভর্তি আছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ৯৪ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে।
এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৩৭ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৪ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৩ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ১০ জন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ জন, আল হারামাইন হাসপাতালে ৫ জন, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ২ জন, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন এবং উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। পাশাপাশি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও একাধিক রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৩ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৩ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১১ জন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ জন, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ১ জন এবং ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন ভর্তি হয়েছেন। রোগীর এই ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োজিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করলেও টিকা না নেওয়া যেকোনো বয়সের মানুষও ঝুঁকিতে থাকেন। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দেওয়া হামের প্রধান লক্ষণ। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব জটিলতার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে এমআর (Measles-Rubella) টিকা গ্রহণ করলে হামের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, নমুনা সংগ্রহ, রোগী শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, কোনো শিশুর জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে এবং নির্ধারিত টিকা সম্পূর্ণ করতে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।


