প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান শিলাপাথর বা অ্যাগ্রিগেট। সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, নদীশাসন থেকে শুরু করে আধুনিক নগরায়ণের প্রতিটি বড় প্রকল্পেই এই নির্মাণসামগ্রীর অপরিহার্য ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের জন্য অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে এবং প্রকল্প ব্যয়ের ভারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেটের নদী ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বিপুল পরিমাণ শিলাসম্পদ সঞ্চিত রয়েছে, যা পরিকল্পিতভাবে আহরণ ও ব্যবহার করা গেলে দেশের অবকাঠামো খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ভূতত্ত্ববিদ গবেষক মো. খাইরুল কবির আদিল এবং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা। গবেষণায় বলা হয়, ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলো দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সিলেটের ভোলাগঞ্জ, রাংপানি ছড়া, ডাউকি নদী, জাফলং ও জয়ন্তিয়া অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বোল্ডার ও গ্র্যাভেল জমা করেছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভোলাগঞ্জ, রাংপানি ছড়া ও ডাউকি নদী এলাকায় প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার বা প্রায় ৬৫ লাখ ঘনমিটার শিলাসম্পদ মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ভোলাগঞ্জ এলাকাতেই দৃশ্যমান বোল্ডারের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার ঘনমিটার। রাংপানি ছড়ায় রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ঘনমিটার এবং ডাউকি নদীতে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ঘনমিটার পাথর।
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই হিসাব প্রাথমিক পর্যায়ের। কিছু এলাকায় পাথরের স্তর ৯ মিটার পর্যন্ত গভীরতায় বিস্তৃত হতে পারে, যা এখনো পূর্ণাঙ্গ জরিপের বাইরে রয়েছে। ফলে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো গেলে এই অঞ্চলে শিলাসম্পদের প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সিলেট অঞ্চলের এসব পাথরের মধ্যে গ্রানাইট, কোয়ার্টজাইট, ব্যাসল্টসহ বিভিন্ন ধরনের শক্ত শিলা রয়েছে, যা প্রকৌশলগত মানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উপযুক্ত। এসব শিলার আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৬৫ থেকে ৩.১২ এবং পানি শোষণ হার মাত্র ০.৩ থেকে ১.০৪ শতাংশের মধ্যে, যা কম ছিদ্রতা ও উচ্চ স্থায়িত্বের নির্দেশক।
এ ছাড়া পরীক্ষায় এসব শিলার সংকোচন সহনশীলতা পাওয়া গেছে ১১ হাজার থেকে ২৭ হাজার ৫০০ পিএসআই পর্যন্ত, যা সড়ক, সেতু ও ভারী অবকাঠামো নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্ষয় পরীক্ষা, আঘাত সহনশীলতা এবং রাসায়নিক স্থায়িত্ব পরীক্ষাতেও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
গবেষকদের মতে, এসব শিলা সড়ক নির্মাণ, রেলপথের ব্যালাস্ট, নদীতীর সংরক্ষণ, সেতুর ভিত্তি এবং জলবাহী কাঠামো নির্মাণে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
দেশের চলমান ও আসন্ন মেগা প্রকল্প যেমন এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, নতুন রেললাইন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও নদীশাসন প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ পাথরের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে এই চাহিদার বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের এই শিলাসম্পদ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, পরিবহন খাত, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষক মো. খাইরুল কবির আদিল বলেন, সিলেট অঞ্চলের শিলাসম্পদ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে। তবে এটি ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও টেকসই নীতি প্রয়োজন।
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বলেন, প্রাকৃতিক এই সম্পদকে সঠিকভাবে চিহ্নিত, সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় অপচয় বা অনিয়ন্ত্রিত আহরণ ভবিষ্যতে পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বড় ধরনের পরিবেশগত উদ্বেগও। সিলেটের পর্যটননির্ভর অঞ্চল এবং নদীভিত্তিক প্রতিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তলদেশ গভীর হওয়া, তীব্র ভাঙন বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মতো ঝুঁকি দেখা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
পরিবেশবিদরা মনে করছেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় না রাখলে এই সম্পদ ভবিষ্যতে উপকারের চেয়ে ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই পরিকল্পিত নীতি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে সিলেটের শিলাসম্পদকে ঘিরে একদিকে যেমন রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে পরিবেশগত ঝুঁকি। এখন সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই সম্পদ দেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে, নাকি নতুন সংকট তৈরি করবে।


