প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হামরকোনা গ্রামে শয়নঘরে ঢুকে প্রতিবন্ধী কিশোরীসহ একটি পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হামলার শিকার পরিবারটির দাবি, অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের ভয়ে তারা এখন নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সিএনজি চালক শেখ ছালাম।
রোববার (১৭ মে) দুপুরে মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি। লিখিত বক্তব্যে শেখ ছালাম দাবি করেন, স্থানীয় বিরোধের জের ধরে তার পরিবারের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, মামলা করার পরও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না করায় তারা আরও বেশি আতঙ্কে রয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ ছালাম বলেন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের হামরকোনা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। গত রমজান মাসে স্থানীয় ব্যক্তি শেখ জুয়েল তাকে মসজিদের ভেতরে অন্যায়ভাবে মারধর করে গুরুতর আহত করেন। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে বিষয়টি আপোষ-মীমাংসা করা হলেও ওই ঘটনার জের থেকেই বিরোধ চলছিল বলে দাবি করেন তিনি।
লিখিত বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, গত ২২ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার ১৭ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী মেয়ে সালমা আক্তার বাড়ির পুকুরঘাটে কাজ করছিলেন। এ সময় শেখ জুয়েলের স্ত্রী আখি বেগম ও তার মা খয়রুন নেছা তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। তার মেয়ে এর প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শেখ ছালামের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর শেখ জুয়েল ধারালো দা নিয়ে তাদের বসতঘরে প্রবেশ করে তার মেয়ের ওপর হামলা চালান। তিনি অভিযোগ করেন, হামলায় তার মেয়ের ডান হাতের কবজি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। এ সময় মেয়েকে টানা-হেঁচড়া করে শ্লীলতাহানির ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, মেয়ের চিৎকার শুনে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে শেখ জুয়েলের সহযোগী আক্কাছ মিয়া তার ওপর হামলা চালান। এতে তার ডান হাতের কনুইয়ের কাছে গুরুতর জখম হয়। পরে হামলাকারীরা ঘরের দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার সময় স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে প্রতিবন্ধী কিশোরী সালমা আক্তারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফেরার কথা থাকলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা নিজ বাড়িতে যেতে পারেননি বলে জানান শেখ ছালাম।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমরা এখনো আতঙ্কে আছি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও নিজের বাড়িতে যেতে পারিনি। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর তারা মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ প্রথমে মামলা নেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে তারা মৌলভীবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে পরে মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা রুজু করা হয়। মামলার নম্বর ০৪/১২৬ এবং মামলাটি দায়ের করা হয় ১ মে ২০২৬ তারিখে।
তবে মামলা দায়েরের পরও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শেখ ছালাম। তার দাবি, অভিযুক্ত শেখ জুয়েল উল্টো কৌশলে তাদের পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। শেখ জুয়েলের মা খয়রুন নেছার মাধ্যমে থানায় একটি মামলা করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। পাশাপাশি শেখ জুয়েল নিজেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আরেকটি মামলা করেছেন বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ ছালাম প্রশাসনের কাছে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করেন তিনি। তার অভিযোগ, হামলার পর থেকে অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, যার কারণে তারা গ্রামে ফিরতে পারছেন না।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ চলে আসছিল। তবে এমন সহিংস ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে একজন প্রতিবন্ধী কিশোরীর ওপর হামলার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ওপর হামলার মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোনো পরিবার যেন বিচারহীনতার কারণে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তারা মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা হলেও আস্থা ফিরে পাবে।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, যেহেতু উভয় পক্ষ থেকেই মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এলাকায় উত্তেজনা কমবে বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা।
বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা শেখ ছালামের পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছে। একটি নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি তারা চাইছেন ন্যায়বিচার। তাদের ভাষায়, “নিজের ঘরে ফিরতে পারাটাই এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।”


