প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হওয়ায় দেশের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর প্রভাবে আগামী পাঁচ দিন সিলেটসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দমকা হাওয়া, বজ্রপাত এবং ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগে টানা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় নগরজীবন, কৃষি এবং জনসাধারণের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটির বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সিলেট, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের অনেক জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে কোথাও কোথাও দমকা বা ঝড়ো হাওয়াও বয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টির কারণে সিলেট অঞ্চলের নিচু এলাকা ও হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এবং থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা কাজ করছে।
সিলেট নগরীতে বুধবার সন্ধ্যার পর থেকেই আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করে। আকাশে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা, বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং মাঝেমধ্যে হালকা বৃষ্টি নগরবাসীর মধ্যে বর্ষার আগাম আবহ তৈরি করেছে। দিনের তুলনায় রাতের পরিবেশ ছিল তুলনামূলক শীতল ও আর্দ্র। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ঢাকায় বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৯৬ শতাংশ। এ সময় দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ সাধারণত দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়িয়ে দেয়। সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হলে তার প্রভাবও সিলেটের নদী ও হাওরাঞ্চলে এসে পড়ে। ফলে অতিবৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কাও বাড়ে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের অনেক জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ সময় সিলেটসহ উত্তরাঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে দেশের অন্যত্র গরমের অনুভূতি কিছুটা বাড়তে পারে।
শুক্রবার ও শনিবারও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। কোথাও কোথাও বজ্রপাতসহ দমকা হাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে বিকেল ও রাতের দিকে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। এতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সিলেট নগরীর কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত কয়েক বছরে বর্ষা মৌসুমে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এবারও টানা কয়েকদিন বৃষ্টি হলে অনেক এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের চলাচলে সমস্যা হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে কৃষকদের মধ্যে বৃষ্টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, বোরো ধান ঘরে তোলার সময় অতিবৃষ্টি হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, সময়মতো বৃষ্টিপাত কৃষিজমির জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আমন মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য বৃষ্টিপাত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
আবহাওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন আবহাওয়ার আচরণ অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। কখনও স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টি, আবার কখনও দীর্ঘ সময় খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে আগাম প্রস্তুতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট অঞ্চলে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাসের কারণে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী এলাকা, নিচু অঞ্চল এবং হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকায় সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া খোলা জায়গায় অবস্থান না করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিলেটের আবহাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বরাবরই বেশি। কারণ বর্ষা এ অঞ্চলের প্রকৃতি, কৃষি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। টানা বৃষ্টি যেমন একদিকে এনে দেয় শীতলতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি তৈরি করে দুর্ভোগ ও উদ্বেগ। তাই আবহাওয়া অফিসের এ পূর্বাভাস এখন সিলেটবাসীর আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
আগামী কয়েকদিন সিলেটের আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। মেঘলা আকাশ, বজ্রসহ বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়ার মধ্য দিয়েই কাটতে পারে সপ্তাহের বাকি সময়। ফলে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্যের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


