প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের চাপে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটের সাধারণ মানুষও এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা কিংবা মসলার বাজার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে। সংসারের হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন নগর ও গ্রামের হাজারো মানুষ। এমন বাস্তবতায় সিলেটের বহু পরিবারের কাছে একরকম স্বস্তির নাম হয়ে উঠেছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি।
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে গত ১১ মে থেকে সিলেট নগরীতে টিসিবির বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নগরীর অন্তত ১০টি পয়েন্টে প্রতিদিন কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছে সরকারি এ সংস্থা। চলমান এই কার্যক্রম আগামী ২১ মে পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন সাধারণ মানুষ। সূর্য ওঠার আগেই কেউ কেউ এসে জায়গা দখল করছেন, যেন পণ্য শেষ হওয়ার আগেই কাঙ্ক্ষিত সামগ্রী সংগ্রহ করা যায়।
টিসিবি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে অন্তত ৪০০ জন ক্রেতার কাছে নির্ধারিত মূল্যে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। একজন ক্রেতা পাচ্ছেন ৫ কেজি চাল অথবা আটা, ২ লিটার সয়াবিন তেল, ২ কেজি মসুর ডাল ও ১ কেজি চিনি। বাজারদরে এসব পণ্য কিনতে যেখানে প্রায় ১২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে টিসিবি দিচ্ছে মাত্র ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ একজন ক্রেতা একবারে প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ৫০০ টাকার গুরুত্ব সাধারণ মানুষের কাছে কতটা বড়, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে টিসিবির ট্রাকের সামনে দাঁড়ানো মানুষের মুখে। অনেকেই বলছেন, এই টাকা দিয়েই তারা বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল কিংবা সন্তানদের ছোটখাটো প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। সংসারের টানাপোড়েনে প্রতিটি সাশ্রয় যেন এখন জীবনের বড় সহায়।
সিলেট নগরীর চৌহাট্টা এলাকার ছোট ব্যবসায়ী মো. রফিক উদ্দিন তেমনই একজন মানুষ। প্রতিদিনের মতো নিজের ব্যবসা সাময়িক বন্ধ রেখে তিনি দাঁড়িয়েছেন দীর্ঘ লাইনে। চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও কথায় ছিল বাস্তবতার নির্মম স্বীকারোক্তি। তিনি বলেন, বাজারে এখন যা অবস্থা, তাতে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। ৫০০ টাকা সাশ্রয় মানে তার পরিবারের জন্য কয়েক দিনের বাড়তি নিশ্চিন্তি। সংকোচ বা লজ্জা এখন আর বড় বিষয় নয়, পরিবারের প্রয়োজনই বড়।
আলিয়া মাদ্রাসা মাঠসংলগ্ন টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্রে কথা হয় আরও কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। কেউ দিনমজুর, কেউ অটোরিকশাচালক, আবার কেউ ছোট চাকরিজীবী। সবার গল্প আলাদা হলেও কষ্টের জায়গাটা যেন একই। আয় বাড়ছে না, কিন্তু বাজারের খরচ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।
নগরীর ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই রোড এলাকায় বসবাসকারী গোয়াইনঘাটের আবুল হোসেনও প্রতিদিনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকলেও শহরে তার প্রতিদিনের যুদ্ধ থেমে নেই। তিনি বলেন, দিনের শেষে হাতে যা থাকে, তা দিয়ে সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না। তাই টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে কিছু টাকা বাঁচাতে পারলে সেটাই বড় উপকার। ঈদের আগে পরিবারের জন্য বাড়তি কিছু নিয়ে যেতে পারার আশাটাও তাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
শুধু রফিক বা আবুল নন, প্রতিদিন সিলেট নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে হাজারো মানুষ টিসিবির পণ্যের জন্য অপেক্ষা করছেন। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৪ হাজার মানুষ এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। তবে বাস্তবে এর প্রভাব আরও বড়। কারণ একটি পরিবারের জন্য কেনা এসব পণ্য পুরো পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সময়ে টিসিবির কার্যক্রম কেবল একটি সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে বাজারে চাহিদা ও দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে এ ধরনের কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা চাপে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। এ অবস্থায় ভর্তুকিভিত্তিক খাদ্য ও নিত্যপণ্য সরবরাহ কর্মসূচি অনেক পরিবারের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
তবে টিসিবির কার্যক্রম ঘিরে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। অনেক জায়গায় অতিরিক্ত ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং হুড়োহুড়ির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বয়স্ক মানুষ ও নারীদের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠছে। কয়েকজন ক্রেতা অভিযোগ করেন, অনেক সময় পণ্য শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, ফলে ঠেলাঠেলির পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।
সিলেটের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। অনেকেই বলছেন, শুধু ঈদ বা বিশেষ সময় নয়, সারা বছরজুড়ে যদি এমন কার্যক্রম চালু রাখা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো নিয়মিতভাবে কিছুটা স্বস্তি পাবে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এখন সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও ধীরে ধীরে ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার ক্ষেত্রেও হিসাব কষে চলছেন। এ বাস্তবতায় টিসিবির ট্রাক যেন শুধু পণ্য বিক্রির জায়গা নয়, বরং মানুষের টিকে থাকার এক ছোট্ট আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত টিসিবির বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভিড় কমে না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে থাকে সামান্য স্বস্তির প্রত্যাশা। কেউ হয়তো ভাবছেন সাশ্রয় হওয়া টাকায় সন্তানের জন্য কিছু কিনবেন, কেউ আবার মাসের বকেয়া বিল মেটানোর কথা ভাবছেন। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এই সামান্য সাশ্রয়ই এখন অনেক পরিবারের জন্য বড় প্রাপ্তি।


