প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় ও দুঃস্থ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য গৃহ নির্মাণ সহায়তা হিসেবে ৪০টি পরিবারের মাঝে ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে। বুধবার সকাল ১১টায় শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সহায়তা তুলে দেওয়া হয় উপকারভোগীদের হাতে।
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ। তিনি উপকারভোগীদের হাতে ঢেউটিন তুলে দেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত উপকারভোগীদের মুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। অনেকেই জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাস করতে গিয়ে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে ঘর মেরামত বা নতুনভাবে চালা দেওয়ার চিন্তায় তারা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। সরকারের এ সহায়তা তাদের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে বলে মনে করছেন তারা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা উপকারভোগীরা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার কারণে তাদের ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক পরিবার ধারদেনা করে কোনোভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করলেও স্থায়ী সমাধান করতে পারেননি। এখন সরকারি সহায়তায় অন্তত ঘরের ছাউনি ঠিক করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ বলেন, সরকার সবসময় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে রয়েছে। প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তা কার্যক্রম চালু রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে যারা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের পুনর্বাসনে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চল হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানে নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর বন্যা, নদীভাঙন ও ঝড়ের কারণে অনেক মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই এসব এলাকার মানুষের জন্য টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি উপকারভোগীদের উদ্দেশে বলেন, সরকারি সহায়তা যেন সঠিকভাবে কাজে লাগে এবং ঘর মেরামতে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা যাচাই-বাছাই করে এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও যেসব পরিবার জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হবে, তাদের পর্যায়ক্রমে সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে উপজেলা প্রশাসন সবসময় কাজ করছে। তিনি জানান, স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবিব, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. আনছার উদ্দিন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. ফারুক আহমদ, মো. নুর আলী, জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুর রশীদ আমিন, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. জালাল উদ্দীন, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক রওশন খান সাগর, যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাশেম নাঈমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আতিউর রহমান, সমাজসেবা কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার লিমা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম, পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার, পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম, পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রুজেল আহমদ, পশ্চিম বীরগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান জায়গীরদার খোকন এবং শিমুলবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
স্থানীয়রা বলছেন, সুনামগঞ্জের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এ ধরনের সহায়তা কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক নিম্নআয়ের পরিবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নিজেদের ঘরবাড়ি সংস্কার করার সামর্থ্য রাখে না। ফলে সরকারি সহায়তা তাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
অনুষ্ঠানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা বহি বিতরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। জানা গেছে, এর আগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপজেলা সমাজসেবা অধিদফতরের বাস্তবায়নে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ৬০৩ জন উপকারভোগীর মাঝে ভাতা বহি বিতরণ করা হয়। এতে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামাজিক নিরাপত্তা ও দুর্যোগ সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, শুধু নগদ সহায়তা নয়, টেকসই পুনর্বাসন ও বাসস্থান নিরাপদ করার উদ্যোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য স্থায়ী ও দুর্যোগ সহনশীল ঘর নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে বুধবারের এই আয়োজন তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বিতরণ কার্যক্রম ছিল না, বরং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে উঠেছে। ঘর হারানোর কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর প্রতিদিনের সংগ্রামের মাঝেও সরকারি সহায়তা অনেক পরিবারের জীবনে স্বস্তির ছোঁয়া এনে দিয়েছে।


