প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়া বাজারে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাতের এই সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে খিদ্রাকাপন ও কোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে একটি জমি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। প্রায় এক বছর আগে জাউয়া কোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বংকু ক্ষিদ্রাকাপন গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান আখলুছ মিয়ার কাছ থেকে একটি জমি ক্রয় করেন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন না হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। এই জটিলতা থেকেই সম্প্রতি উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথাকাটাকাটির ঘটনা ঘটে। সেই উত্তেজনার জের ধরে শুক্রবার সন্ধ্যায় জাউয়া বাজার এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথম দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও রাত নয়টার দিকে তা আবারও ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও ধারালো বস্তু নিয়ে দুই গ্রামের মানুষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় পুরো জাউয়া বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটোছুটি করতে থাকেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। আহতদের স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষের কারণে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে তীব্র যানজট ও ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। ওই সময় সড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং এক পর্যায়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার যানবাহনসহ স্থানীয় পরিবহনও আটকে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, সংঘর্ষের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এই সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট ও আশপাশের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
এ ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের আহত হওয়ার ঘটনা। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি সিলেট যাওয়ার পথে ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি দেখে নেমে আসেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় হঠাৎ ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি পায়ে আঘাত পান। তবে তাঁর আঘাত গুরুতর নয় বলে জানা গেছে।
ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মিজানুর রহমান জানান, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে শান্ত করা হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে এলাকায় কোনো ধরনের উত্তেজনা নেই এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয় বলে দাবি তাদের। তারা মনে করছেন, দ্রুত ও কার্যকর সালিশ বা আইনি সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আবারও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট এলাকার সচেতন মহল বলছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে জমি সংক্রান্ত বিরোধগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে তা সহিংসতায় রূপ নেয়, যা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সামাজিক শান্তিও বিঘ্নিত করে। জাউয়া বাজারের এই ঘটনা তারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ।
এদিকে সংঘর্ষের পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ ও প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে যাতে নতুন করে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দুই পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ছাতকের এই সংঘর্ষ শুধু দুটি গ্রামের বিরোধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও স্থানীয় বিরোধ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সময়মতো সমাধান না হলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

