প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবারের বৈশাখে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে প্রতি বছর এই সময়টিতে সোনালি ধানের ঝলক, পাকা ফসল তোলার ব্যস্ততা আর কৃষকের মুখে আনন্দের হাসি ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে এবার চারপাশে নেমে এসেছে নিঃশব্দ হাহাকার। পানির নিচে তলিয়ে গেছে বছরের পর বছরের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা স্বপ্ন, আর সেই সঙ্গে ভেঙে পড়েছে হাজারো কৃষক পরিবারের আশা-ভরসা।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জেলার হাওরাঞ্চলে এবার এক-তৃতীয়াংশ ধান কাটা সম্ভব হলেও বাকি দুই-তৃতীয়াংশ ফসল এখনো জমিতেই রয়ে গেছে, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কাটা ধান সময়মতো শুকাতে না পারায় তা পচে নষ্ট হচ্ছে, আবার কোথাও জমিতে রাখা ধানে চারা গজিয়ে পুরো ফসলই অকেজো হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকট।
নবীগঞ্জ উপজেলার বৈলাকিপুর গ্রামের কৃষক অলিউর রহমানের কণ্ঠে ছিল গভীর হতাশা। তিনি জানান, সময়মতো ধান কাটতে পারলেও রোদ না থাকায় সেগুলো ঠিকমতো শুকানো যায়নি। ফলে সব ধান পচে গেছে। তার ভাষায়, “খাওয়ার মতো এক মণ ধানও থাকবে না। এত কষ্ট করে ফসল ফলালাম, কিন্তু সবই শেষ হয়ে গেল। এখন বিক্রি তো দূরের কথা, নিজের খাওয়ার জন্যও কিছু থাকবে কি না জানি না।” কৃষিকাজকে তিনি জীবিকার শেষ ভরসা মনে করলেও এখন সেই ভরসাও ক্ষয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।
বৈশাখ মাসের ঐতিহ্যবাহী আনন্দের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, এই সময়টায় হাওরের প্রতিটি গ্রামে উৎসবের আমেজ থাকে। নতুন ধান ঘরে ওঠে, পরিবারে আনন্দের ঢেউ লাগে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। “এবার কারও মুখে হাসি নেই,”—এই এক বাক্যে তিনি পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের কৃষক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী জানান, খোয়াই নদীর পানি সামান্য বাড়লেই হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। এবার ধান পাকতে শুরু করার সময়ই পানি ঢুকে পড়ায় অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “নিজেদের খাবারই যদি না থাকে, তাহলে উৎসব করব কীভাবে? এবার বৈশাখ আমাদের জন্য আনন্দ নয়, কষ্টের স্মৃতি হয়ে থাকবে।”
একই এলাকার আরেক ধানচাষী শিবলী চৌধুরী জানান, তিনি মাত্র ৩০ শতক জমির ধান তুলতে সক্ষম হয়েছেন, বাকি জমির ধান এখনো পানির নিচে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন ছিল যে শ্রমিক সংকট এবং পানির কারণে হারভেস্টার মেশিনও মাঠে নামানো সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল নষ্ট হওয়া ঠেকানো যায়নি।
আতুকুড়া গ্রামের কৃষক এস এম সুরুজ আলী বলেন, যেটুকু ধান কাটা হয়েছে তাও ভেজা অবস্থায় পড়ে ছিল, ফলে তা পচে গেছে। তার মতে, এবারের মৌসুমে প্রকৃতি ও সময়ের বিরূপতার কারণে কৃষকের কোনো প্রস্তুতিই কাজে আসেনি। “সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে,”—এই কথায় তার হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাওরাঞ্চলের এই দুরবস্থা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন চাল। তবে এখন পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, কিন্তু বাকি ৭৮ হাজার ৯০৫ হেক্টর জমির ফসল এখনো মাঠে রয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশই পানিতে নিমজ্জিত। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রকৃত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল বলেন, এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু হঠাৎ পানি বৃদ্ধি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কৃষকদের বড় ক্ষতি হয়েছে। তিনি কৃষকদের আগাম চাষাবাদ এবং স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান আবাদে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো যায়।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে খোয়াই নদীর পানি বেড়ে কিছু এলাকায় বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। এতে প্রায় ২৪ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, পানি কমতে শুরু করেছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে এবং জনগণের জন্য হেল্পলাইনও চালু করা হয়েছে।
হাওরের এই দুর্যোগ শুধু একটি মৌসুমের ক্ষতি নয়, বরং হাজারো কৃষকের জীবনের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। যে বৈশাখ একসময় ছিল আনন্দ আর উৎসবের প্রতীক, তা এখন অনেকের কাছে পরিণত হয়েছে বেদনা, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের অন্ধকারের প্রতিচ্ছবিতে। কৃষকের চোখে এখন শুধু হারানো ফসলের ছবি, আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস।


