প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অকাল প্লাবনে বিপর্যস্ত কৃষক এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ মোকাবিলায় জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। হাওর অঞ্চলের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি, কৃষকের আর্থিক দুরবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি সরকারের কাছে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর বরাবর এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে সাম্প্রতিক সময়ে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকরা শুধু ফসলই হারাননি, হারিয়েছেন বছরের সঞ্চয়, জীবিকার ভরসা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও।
কৃষি বিভাগের তথ্য উল্লেখ করে স্মারকলিপিতে বলা হয়, শুধু সুনামগঞ্জ জেলাতেই প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে ভিজে অঙ্কুরিত ও পচে নষ্ট হয়েছে। এতে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দুরবস্থা তুলে ধরে স্মারকলিপিতে বলা হয়, অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ধান ঘরে তোলার আগেই তা পানির নিচে চলে যাওয়ায় তারা এখন ঋণের বোঝা, সংসারের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় কাটা ধানও বৃষ্টির কারণে শুকানো সম্ভব হয়নি। ফলে সেগুলোতেও চারা গজিয়েছে এবং পচন ধরেছে। এতে কৃষকের ক্ষতি আরও বেড়েছে।
স্মারকলিপিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বেশ কিছু স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, বর্তমানে যেসব খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তার মেয়াদ তিন মাসের পরিবর্তে অন্তত ছয় মাস করা প্রয়োজন। কারণ অনেক পরিবার একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। ফসল হারানোর ফলে তাদের সামনে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে।
এছাড়া কৃষিঋণের কিস্তি মওকুফ বা পুনঃতফসিল এবং সুদের হার কমানোর দাবিও জানানো হয়েছে। স্মারকলিপিতে বলা হয়, কৃষক যদি এই দুর্যোগের পরও ঋণের চাপে জর্জরিত থাকেন, তাহলে তারা পরবর্তী মৌসুমে নতুন করে চাষাবাদে আগ্রহ হারাতে পারেন। ফলে কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সহায়তা এবং গবাদিপশুর খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কারণ হাওরাঞ্চলের অনেক পরিবার শুধু কৃষির ওপর নয়, গবাদিপশুর ওপরও নির্ভরশীল। বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পশুখাদ্যের সংকটও দেখা দিয়েছে।
স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথাও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, অনেক শিক্ষার্থীর বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ দ্রুত মেরামতের দাবি জানানো হয়েছে, যাতে পরবর্তী বন্যা বা ঢলের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
তবে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও জোর দিয়েছেন শিশির মনির। স্মারকলিপিতে বলা হয়, প্রতিবছর একই ধরনের দুর্যোগে হাওর অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিবেশগত ও পানি প্রবাহ ব্যবস্থার সমন্বিত পর্যালোচনা জরুরি।
তিনি নদী-নালা ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি হাওর রক্ষা বাঁধের মানোন্নয়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং আধুনিক স্লুইস গেট নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে আগাম পানি ঢুকে ফসলের ক্ষতি বাড়ে।
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে হাওরাঞ্চলে বিশেষ টাওয়ার স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কারণ প্রতিবছর বজ্রপাতে কৃষক ও শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এছাড়া বন্যা সহনশীল ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন, কৃষি বিমা চালু এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরাঞ্চল আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে উল্লেখ করে স্মারকলিপিতে বলা হয়, এই অঞ্চলের জন্য জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় প্রতিবছরের দুর্যোগ শুধু কৃষি নয়, পুরো স্থানীয় অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করে তুলবে।
হাওর অঞ্চলের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিশির মনির বলেন, এই অঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। তাদের জন্য শুধু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা, যাতে কৃষক ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপন করতে পারেন।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের অনেকে স্মারকলিপিটিকে সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, হাওরের সমস্যা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হলেও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকে যায়। ফলে প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
সব মিলিয়ে, হাওরাঞ্চলের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের এই স্মারকলিপি নতুন করে আলোচনায় এনেছে কৃষক, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় এবং বাস্তবায়নের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কারণ হাওরের কৃষকরা এখন শুধু সহানুভূতি নয়, টিকে থাকার জন্য কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান প্রত্যাশা করছেন।


