প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ছাতকে একটি পোল্ট্রি খামারে হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক মোরগের মৃত্যু ঘিরে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। খামার মালিকের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বিষ প্রয়োগ করে তার খামারের প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০টি বাউন কক জাতের মোরগ মেরে ফেলা হয়েছে। এতে তার অন্তত সাড়ে তিন লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি শুধু একটি খামারের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং স্থানীয়ভাবে পারিবারিক বিরোধ, প্রতিশোধ এবং নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।
ভুক্তভোগী খামার মালিক মোহাম্মদ হুশিয়ার আলী ছাতক পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের বসতঘরের দ্বিতীয় তলায় পোল্ট্রি খামার পরিচালনা করছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমিত পুঁজি দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি খামারটি গড়ে তুলেছিলেন। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখেই কয়েক হাজার মোরগ নিয়ে খামার ব্যবসায় যুক্ত হন। কিন্তু এক রাতের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে হুশিয়ার আলী নিয়মিতভাবে খামার পরিদর্শন করে ঘুমাতে যান। তখন সবকিছু স্বাভাবিক ছিল বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু পরদিন সকাল ৬টার দিকে খামারে গিয়ে তিনি ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। সারি সারি মোরগ মেঝেতে মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। যেসব মোরগ বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানো এবং ঋণ শোধের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেগুলোই এখন নিথর দেহ হয়ে পড়ে আছে।
হুশিয়ার আলীর দাবি, এতে তার প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কারণ এসব বাউন কক জাতের মোরগ বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয় এবং খামারটির বেশ সুনামও ছিল।
ঘটনার পরপরই তিনি ছাতক থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, জায়গা-জমি ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তার শ্বশুর মোহাম্মদ আবুল মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছিল। সেই পূর্বশত্রুতার জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে তার খামারে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে তিনি সন্দেহ করছেন। অভিযোগে কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অভিযুক্ত আবুল মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া এসেছে। আবুল মিয়ার স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ঘটনাটি সত্য হতে পারে বলে তার ধারণা। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মেয়ের জামাইকে বিভিন্নভাবে চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। তাদের ছেলে ও মেয়েও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তবে মূল অভিযুক্ত আবুল মিয়াকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকরা তার বাড়িতে গেলে ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান।
ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে পারিবারিক বিরোধের ভয়াবহ রূপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এলাকায় আগে থেকেই উভয় পরিবারের মধ্যে বিরোধের কথা সবাই জানতেন। তবে সেই বিরোধ এত বড় ক্ষতির ঘটনায় গড়াবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
এদিকে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিলন মিয়া জানিয়েছেন, খামারটি প্রাথমিকভাবে পরিদর্শন করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত মোরগগুলোর শরীরে কোনো বাহ্যিক রোগের স্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া যায়নি। একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক মোরগের মৃত্যু স্বাভাবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সিলেট ল্যাবে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোল্ট্রি খামারে রোগবালাইয়ের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এক রাতের মধ্যে শত শত বা হাজারের বেশি মুরগি মারা গেলে তা গভীর তদন্তের দাবি রাখে। কারণ এতে বিষক্রিয়া, খাদ্যে দূষণ অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যমূলক নাশকতার বিষয় থাকতে পারে। তাই পরীক্ষাগারের রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন উপপরিদর্শককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে ছাতক উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও থানার ওসির সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করা হবে বলে জানান।
স্থানীয় অর্থনীতিতে ছোট ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক পরিবার এসব খামারের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাই এমন একটি ঘটনায় শুধু একজন খামারির আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, বরং অন্য খামারিদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, খামারের নিরাপত্তা এবং পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি এখন নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত খামার মালিকের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক বিরোধের ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ছাতকের এই ঘটনাটি এখন শুধু একটি পোল্ট্রি খামারের ক্ষতির গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে স্বপ্নভঙ্গ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ বাস্তবতার এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা কী দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে হুশিয়ার আলীর মতো একজন খামারির কাছে রাতারাতি শত শত মোরগের মৃত্যু মানে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং বহুদিনের পরিশ্রম, আশা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভেঙে পড়া এক নির্মম বাস্তবতা।


