বজ্রপাত-জোঁকের ভয়ে হাওরে ধান কাটার শ্রমিক সংকট

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন এক গভীর উৎকণ্ঠা, হতাশা আর অসহায় সময় পার করছেন হাজারো কৃষক। একদিকে আগাম বৃষ্টি ও পানিতে তলিয়ে যাওয়া বোরো ধান, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট—সব মিলিয়ে কৃষকের চোখে এখন অনিশ্চয়তার ছাপ। মাঠে পাকা ধান দাঁড়িয়ে থাকলেও তা কাটার মানুষ নেই। কারণ, শ্রমিকদের মনে ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুটি বিষয়—বজ্রপাত এবং জোঁক। প্রাণহানির আতঙ্কে অনেকে জমিতে নামতে চাইছেন না। ফলে ধান পচে যাচ্ছে, চারা গজাচ্ছে, আর কৃষকের বহু মাসের পরিশ্রম মুহূর্তেই হারিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে।

হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকদিনের রোদ পেয়ে কৃষকরা মরিয়া হয়ে ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। কেউ রাস্তার পাশে, কেউ বাড়ির উঠানে, আবার কেউ খোলায় ধান ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অনেক ধানেই ইতোমধ্যে চারা গজিয়েছে। কোথাও পচন ধরেছে, কোথাও আবার ধান কালচে হয়ে গেছে। তবুও বাঁচানো যায় কি না, সেই আশায় কৃষকরা শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের কৃষক হরেন্দ্র সরকার বলেন, তার কাটা ধানের প্রায় সবগুলোতেই চারা উঠে গেছে। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন, এত খরচ করার পরও এখন আর নতুন করে কিছু করার সাহস পাচ্ছেন না। জমিতে থাকা ধান পচে গেলেও যেন আর কিছু করার নেই। তার ভাষায়, আগে শ্রমিকরা বজ্রপাতের ভয় দেখিয়ে পানিতে নামেনি, এখন তারা জোঁকের ভয় পাচ্ছে। ফলে টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।

লাখাই উপজেলার গোয়াখারা গ্রামের কৃষক ইলিয়াছ মিয়া বলেন, কয়েকদিন আগেই যেসব ধান গোলায় তোলার কথা ছিল, সেগুলো এখনো মাঠে স্তূপ করে পড়ে আছে। অবিরাম বৃষ্টি আর শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। এখন অধিকাংশ ধানেই চারা গজিয়েছে এবং পচন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকের চোখের সামনে ফসল নষ্ট হওয়ার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান কৃষক বাবুল মিয়া। তিনি বলেন, শ্রমিক না পেয়ে নিজেই বুকসমান পানিতে নেমে কিছু ধান কেটে এনেছিলেন। কিন্তু সেই ধান সরকারি গুদামে নিতে চাওয়া হয়নি। অভিযোগ করে তিনি বলেন, নানা অজুহাতে কৃষকদের ধান ফিরিয়ে দেওয়া হলেও দালালদের মাধ্যমে ঠিকই নিম্নমানের ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে কৃষকের ক্ষোভ আরও বাড়ছে। তিনি বলেন, আগাম বৃষ্টি শুধু জমি তলিয়ে দেয়নি, কৃষকের দরকষাকষির শক্তিও কেড়ে নিয়েছে।

হাওরাঞ্চলের আরেক কৃষক ভিংরাজ মিয়া বলেন, কৃষি বিভাগ শ্রমিক জোগাড়ের চেষ্টা করছে বলে শুনলেও বাস্তবে তেমন কোনো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত মজুরি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, এবার বোঝা গেছে শুধু টাকা থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। মানুষ যখন প্রাণের ভয় পায়, তখন অর্থও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

তিনি আরও বলেন, নিজের কষ্টে কাটা কিছু ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা শর্ত ও অজুহাতে তা নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। শুধু তিনিই নন, অধিকাংশ কৃষক এখন একই পরিস্থিতির মুখোমুখি।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও প্রায় ৭৮ হাজার ৯০৫ হেক্টর জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ধানের পরিমাণ প্রায় ৪৩ হাজার ২৩০ মেট্রিক টন, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২১২ কোটি টাকার কাছাকাছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২২ হাজার ৬৭২ জন বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের পাশে রয়েছেন এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যেসব কৃষক সহযোগিতা চাইছেন, তাদের শ্রমিক জোগাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার বিষয়েও আশ্বাস দেন তিনি।

এদিকে বজ্রপাতের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও অন্যান্য বছরের তুলনায় এ সংখ্যা কম। তিনি বলেন, মানুষ আগের চেয়ে সচেতন হচ্ছেন। তবে হাওরাঞ্চলে ছোট ছোট নিরাপদ ছাউনি নির্মাণ করা গেলে কৃষকরা বজ্রপাতের সময় আশ্রয় নিতে পারবেন এবং এতে প্রাণহানি আরও কমানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলে কৃষি এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। কখনো আগাম বন্যা, কখনো অতিবৃষ্টি, আবার কখনো বজ্রপাত কৃষকের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। এর সঙ্গে শ্রমিক সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে হাওরাঞ্চলের জন্য বিশেষ কৃষি নীতি, দ্রুত ধান কাটার প্রযুক্তি এবং নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

স্থানীয়দের মতে, হাওরের কৃষক শুধু ফসল হারাননি, হারিয়েছেন বছরের সঞ্চয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং সংসারের নিরাপত্তাও। অনেক কৃষক ঋণ করে চাষ করেছিলেন। এখন সেই ঋণ কীভাবে শোধ হবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

সব মিলিয়ে, হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন কৃষকের জীবন যেন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা পাকা ধান, জমে থাকা পানি, জোঁকের ভয় আর আকাশজুড়ে বজ্রপাতের আশঙ্কা—সবকিছু মিলিয়ে কৃষকের চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তা। তবুও তারা আশায় বুক বাঁধছেন, হয়তো কোনোভাবে কিছু ধান বাঁচানো যাবে, হয়তো আবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

গোয়াইনঘাটে স্ত্রীকে কুপিয়ে জখম, স্বামী আটক

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানিতে ডুবে নিখোঁজের দুইদিন পর হাওরে মিলল কৃষকের লাশ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাওরের ক্ষতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ চেয়ে শিশির মনিরের স্মারকলিপি

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জের ছাতকে খামারে বিষ প্রয়োগ, লাখ টাকার ক্ষতিতে খামারি

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জ মহাসড়কে ডাকাতি, লুট দুই লাখ টাকা

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

গোয়াইনঘাটে স্ত্রীকে কুপিয়ে জখম, স্বামী আটক

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানিতে ডুবে নিখোঁজের দুইদিন পর হাওরে মিলল কৃষকের লাশ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জ মহাসড়কে ডাকাতি, লুট দুই লাখ টাকা

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে কঠোর পুলিশ অভিযানে আটক প্রায় ১৪ হাজার যানবাহন

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিশ্বনাথে পরীক্ষাকেন্দ্রে ভুল, দায়িত্ব হারালেন সচিব

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শিশুর গলায় ছুরি, মায়ের স্বর্ণালংকার ছিনতাই

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ