প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমায় দিনের আলোতেই এক নারী ও তার শিশু সন্তানকে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার ছিনতাইয়ের অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে মাদরাসায় যাওয়ার পথে সংঘটিত এ ঘটনা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুর গলায় ছুরি ধরে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নগরবাসীর অনেকেই বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই ও সড়ক অপরাধের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানা গেছে, গত ৬ মে সকাল আনুমানিক সোয়া ৮টার দিকে দক্ষিণ সুরমার চান্দাই পশ্চিমপাড়া পিরবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় হোসাইন আহমদের স্ত্রী শামিমা নাসরিন তাদের ছোট শিশুসন্তানকে নিয়ে স্থানীয় একটি মাদরাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই তিনি সন্তানকে নিয়ে পথ চলছিলেন। কিন্তু পথের মাঝখানে পৌঁছানোর পরই তাদের সামনে হাজির হয় একটি মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেলে থাকা দুই যুবক আচমকা নেমে এসে তাদের লক্ষ্য করে ভয়ঙ্কর আচরণ শুরু করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল থেকে নেমে একজন যুবক শিশুটির গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখায়। একই সময় অপর যুবক শামিমা নাসরিনের গলা চেপে ধরে তার পরনে থাকা স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে মা ও সন্তান দুজনই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঘটনাস্থলে তখন মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। ফলে ছিনতাইকারীরা খুব দ্রুত তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ছিনতাইকারীরা শামিমা নাসরিনের গলা থেকে একটি স্বর্ণের চেইন এবং কান থেকে দুই জোড়া স্বর্ণের রিং নিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো ঘটনার সময় শিশুটি ভয়ে কান্না করছিল এবং ওই নারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী নারীর স্বামী হোসাইন আহমদ। অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং স্থানীয় তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, দক্ষিণ সুরমা এলাকায় সম্প্রতি মোটরসাইকেলচালিত ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষ করে সকালে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং নারীরা এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে চলাচল করছেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, অপরাধীরা এখন নির্জন গলি কিংবা তুলনামূলক কম ব্যস্ত সড়ককে টার্গেট করছে। তারা দ্রুত মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাই সংঘটিত করে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এলাকাবাসীর মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা ও নজরদারিও জরুরি হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলিতে সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানো এবং নিয়মিত পুলিশ টহল জোরদার করা গেলে এমন ঘটনা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ছিনতাইয়ের ধরন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ভয়ংকর ও সংঘবদ্ধ হয়ে উঠছে। আগে যেখানে টাকার ব্যাগ বা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যেত, এখন সেখানে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত ও আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মানবাধিকারকর্মীরাও ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, একটি শিশুর গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখানোর অভিযোগ শুধু ছিনতাই নয়, এটি সমাজে অপরাধের নৃশংস রূপের প্রতিফলন। তারা বলছেন, এমন ঘটনা শিশুদের মনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, ভুক্তভোগী পরিবারকে মানসিক সহায়তাও দেওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে, অনেকেই দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, শহরের ভেতরে দিনের বেলায় এমন ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। আবার অনেকেই পুলিশের আরও সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট মহানগরে ছিনতাই ও চুরির একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে। কয়েকদিন আগেই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ দাবি করেছিল, গত আট মাসে তারা ৩১৪ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। এরপরও নতুন করে এ ধরনের ঘটনা সামনে আসায় নগরবাসীর উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু পরিসংখ্যান নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি দেখতে চান তারা।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুটি ঘটনার পর থেকে ভীত হয়ে পড়েছে। পরিবারটির দাবি, দ্রুত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হোক। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের কাছে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ সুরমার এই ঘটনা আবারও নগর নিরাপত্তা এবং নারী-শিশুর সুরক্ষার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে তা জনমনে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারেন।


