প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে এখন প্রকৃতির রূপ যেন একই সঙ্গে সুন্দর ও নির্মম। কখনো ঝলমলে রোদ, কখনো কালো মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশ, হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া আর টানা বর্ষণ—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছেন হাওরপারের কৃষকেরা। কয়েক মাসের শ্রম, ঋণ, স্বপ্ন আর সংসারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মাঠের পাকা ধানের ওপর। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির পানিতে সেই সোনালি ধানখেত ডুবে যেতে শুরু করেছে। ফলে কৃষকের চোখে এখন আর ঘুম নেই, মনে নেই শান্তি।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে যেন অদ্ভুত এক ব্যস্ততা। দূর থেকে মনে হতে পারে কোনো উৎসব চলছে। ছোট ছোট নৌকা হাওরের বুক চিরে পাড়ের দিকে ভেসে আসছে। নৌকাভর্তি ধানের আঁটি নামিয়ে কৃষকেরা দ্রুত শুকনা স্থানে রাখছেন। কেউ ধান মাড়াই করছেন, কেউ ভেজা ধান বস্তায় ভরছেন। আবার কেউ সেই বস্তা মাথায় তুলে ট্রাকে তুলছেন। সময়ের সঙ্গে যেন প্রতিযোগিতা চলছে। কারণ একটু দেরি হলেই পানির নিচে হারিয়ে যেতে পারে পুরো ফসল।
বিরইমাবাদ গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়ার চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ। তিনি জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে হাওরের পানি অনেক বেড়ে গেছে। তাঁর ৩০ কিয়ার জমির মধ্যে অধিকাংশই এখন পানির নিচে। মাত্র দুই কিয়ার ধান কাটতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ধান পুরোপুরি পেকে গেছে, কিন্তু কাটার সময় মিলছে না। একদিকে পানি বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকের সংকট। যারা কাজ করতে আসছেন, তাদের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এর বাইরে যাতায়াত খরচ, নৌকা ভাড়া—সব মিলিয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। তারপরও শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাওরের আরেক কৃষক শাহজান মিয়ার কণ্ঠেও হতাশা। সাড়ে পাঁচ কিয়ার জমির মাত্র আড়াই কিয়ার ধান কাটতে পেরেছেন। বাকিটা পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, গত চার দিনে পানি এত দ্রুত বেড়েছে যে ধানের শিষ পর্যন্ত ডুবে গেছে। এখন আর ধান বাঁচানোর তেমন আশা দেখছেন না।
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা বলেন কবির মিয়া। তাঁর ১৫ কিয়ার জমি পানির নিচে। এর মধ্যে মাত্র চার কিয়ারের ধান কোনোভাবে তুলতে পেরেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন ধান যেন কৃষকের নয়, নৌকার। কারণ নৌকার ভাড়া এত বেড়েছে যে কৃষক শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।
রাজনগর চা-বাগানের বাসিন্দা সত্যনারায়ণ নুনিয়ার গল্প আরও বেদনাদায়ক। লাভের আশায় তিনি আড়াই লাখ টাকায় দুটি গরু বিক্রি করে ৩০ কিয়ার জমিতে বর্গাচাষ করেছিলেন। ধান পুরোপুরি পাকেনি বলে কাটার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঢলের পানি এসে সব তলিয়ে নেয়। এখন তাঁর চোখে শুধু হতাশা। তিনি বলেন, সব টাকা জমিতে ঢেলেছেন, অথচ এখন পুরো ফসল পানির নিচে। শ্রমিকের মজুরি এত বেশি যে চাইলে ধান কাটাও সম্ভব নয়।
শুধু একজন-দুজন নয়, হাওরপারের শত শত কৃষকের একই অবস্থা। মনিলাল ভরের দুই কিয়ার, পারভেজ মিয়ার ২৫ কিয়ার, বাবুল নুনিয়ার ছয় কিয়ার, জয়কুমার নুনিয়ার ১০ কিয়ার এবং শিপন মিয়ার ১৫ কিয়ার জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চাউরুলির হানিফ মিয়া জানান, ২২ কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র পাঁচ কিয়ারের ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি ধান নিয়ে আর কোনো আশা নেই তাঁর।
কৃষকদের এই দুর্দশার পেছনে রয়েছে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ায় হাওরে দ্রুত পানি বেড়ে গেছে। সাধারণত পুরো মাসে যেখানে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র দুই দিনেই প্রায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ফলে নিচু এলাকা দ্রুত প্লাবিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানান, জেলার নদ-নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচে থাকলেও হাওরে পানি কিছুটা বেড়েছে। তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। কাউয়াদীঘি হাওরের পানি কমাতে সেচ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ থাকলে তা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রাথমিক হিসাবে হাওরাঞ্চলের ৯৪১ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। পাশাপাশি শিলাবৃষ্টিতেও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, হাওরের কৃষকেরা কোমর ও গলা পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডুবে যাওয়া ধানের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কৃষকেরা উদ্ধার করতে পারবেন। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে সেই সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বছরের একটি মৌসুমের ফসলই অনেক পরিবারের সারা বছরের ভরসা। সেই ফসল যদি পানির নিচে হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। কৃষকদের চোখে তাই এখন শুধু আতঙ্ক—আরেক দফা বৃষ্টি নামলে হয়তো শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষকেরা দ্রুত সরকারি সহায়তা, শ্রমিক সংকট নিরসন এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা দাবি করেছেন। কারণ তাঁদের ভাষায়, হাওরের পানি শুধু ধানখেত ডুবাচ্ছে না, ডুবিয়ে দিচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন, ঘুম আর শান্তিও।


