প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রাক-বর্ষা মৌসুম এলেই বজ্রপাত যেন এক নীরব আতঙ্ক হয়ে দেখা দেয়। হাওরাঞ্চল, খোলা মাঠ, নদী তীর কিংবা গ্রামীণ জনপদ—কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকে না। কয়েক সেকেন্ডের বজ্রঝলক আর বিকট শব্দ কেড়ে নেয় অসংখ্য প্রাণ। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সুনামগঞ্জকে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি।
সোমবার (৪ মে) সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির সুরমা প্ল্যান্টের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে মাসব্যাপী বজ্রপাত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। আয়োজকরা জানান, শুধু সচেতনতার অভাবেই অনেক মানুষ বজ্রপাতের সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রাণ হারান। তাই সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে দেশে ৩ হাজার ৬৫৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ২৬৩ জন। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সারাদেশে বজ্রপাতে ৬৪ জনের মৃত্যু দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বেড়েছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে সুনামগঞ্জ অঞ্চলে। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে এর প্রকোপ বেশি থাকে। হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, কৃষিকাজে মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে মাঠে কাজ করার সময় অনেক কৃষক বজ্রপাতে প্রাণ হারান। ফলে এই দুর্যোগ এখন শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং একটি বড় জননিরাপত্তা ইস্যু হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বজ্রপাতের সময় করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়। আয়োজকরা জানান, উন্মুক্ত স্থান বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বজ্রপাত শুরু হলে যত দ্রুত সম্ভব খোলা জায়গা ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে মাঠ, নদী, বিল কিংবা জলাশয়ের কাছাকাছি অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, বজ্রপাতের সময় পানির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা জরুরি। গোসল করা, থালা-বাসন ধোয়া কিংবা নদীতে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যদি কেউ নৌকায় বা নদীর মাঝখানে থাকেন, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব তীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা উঁচু ও বিচ্ছিন্ন স্থাপনার নিচে আশ্রয় না নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ। তবে ঘরের মেঝেতে শুয়ে থাকা, জানালা বা বারান্দার কাছে দাঁড়ানো কিংবা তারযুক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করাও বিপজ্জনক হতে পারে। বিকট শব্দের প্রভাব কমাতে হাত দিয়ে কান ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া বজ্রপাত থেমে যাওয়ার পরও অন্তত ৩০ মিনিট বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের কান্ট্রি ইনভায়রনমেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ মহিউদ্দীন, ডিজিএম হেলথ অ্যান্ড সেফটি শহীদুর রহমান, ডেপুটি ম্যানেজার সিএসআর ও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট লায়লা পারভীন হিমেল এবং ডেপুটি ম্যানেজার হেলথ অ্যান্ড সেফটি অশোক চৌধুরী। তাঁরা বলেন, শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে চায়।
লাফার্জহোলসিম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো মে মাসজুড়ে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সুরমা প্ল্যান্টসংলগ্ন প্রায় ৪০টি গ্রামে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ, আলোচনা ও জনসচেতনতামূলক সেশন আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। টেঙ্গারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রোশনা বেগম বলেন, আগে বজ্রপাতের সময় কী করা উচিত, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, এখন তিনি শুধু নিজেই সচেতন থাকবেন না, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এসব বিষয় জানাবেন।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি কমাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলোতে স্কুল পর্যায় থেকেই বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার শিক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃতভাবে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে হাওর ও গ্রামীণ অঞ্চলে স্থানীয় ভাষায় সহজভাবে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে মানুষ দ্রুত তা গ্রহণ করতে পারবেন।
তারা আরও বলেন, বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার পরও এখনো পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।
সুনামগঞ্জের মতো বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে লাফার্জহোলসিমের এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সচেতনতা বাড়লে অন্তত অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দুর্যোগ পুরোপুরি থামানো না গেলেও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত জীবন বাঁচাতে পারে—এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চায় এই কার্যক্রম।


