প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারিগুলো নিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সরকার। পাথর ও বালু উত্তোলনের বর্তমান পরিস্থিতি, পরিবেশগত ঝুঁকি, স্থানীয় অর্থনীতি এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার প্রশ্নকে সামনে রেখে এবার করণীয় নির্ধারণে উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে আগামী বৃহস্পতিবার (৭ মে) একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিরা অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১১ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সরোয়ার স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে এই সভার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সভায় সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারিগুলোর সার্বিক অবস্থা, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশগত সংকট এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো সমন্বিত নীতিমালার আওতায় সীমিত পরিসরে পাথর উত্তোলনের সুযোগ রাখা যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
সভায় অংশ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসকরা। জানা গেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকায় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ভার্চুয়ালি সভায় অংশ নেবেন।
সিলেট অঞ্চলের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও ছাতক এলাকার পাথর কোয়ারিগুলো একসময় দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। হাজার হাজার শ্রমিক সরাসরি এসব কোয়ারিতে কাজ করতেন। পাশাপাশি পরিবহন, যন্ত্রপাতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস, নদীভাঙন, পাহাড় ক্ষয় এবং শ্রমিকদের প্রাণহানির মতো নানা অভিযোগের কারণে ধীরে ধীরে অধিকাংশ কোয়ারিতে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষ করে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর অনেক কোয়ারিতে সম্পূর্ণভাবে উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়। পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, অপরিকল্পিত ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের ফলে নদী ও পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খনিজ সম্পদ আহরণের নামে অনেক এলাকায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীরভাঙন এবং ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকে জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। কেউ কেউ চরম আর্থিক সংকটে পড়ে পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে দাবি তাদের। ফলে কোয়ারি চালুর দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাথর উত্তোলন বন্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। যাদের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল পাথর কোয়ারি, তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবারে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে এনে পাথর উত্তোলনের প্রশ্নে আশ্বাস দিয়েছিলেন বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, পরিবেশের ক্ষতি না করে সনাতন বা নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে হলেও পাথর উত্তোলনের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। সেই প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতেই এবার সরকারিভাবে আলোচনার উদ্যোগকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তবে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে কোয়ারি খুলে দিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। তাঁদের মতে, সিলেটের নদী, পাহাড় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে পরিবেশসম্মত প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশেও যদি আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ এবং পরিবেশ সুরক্ষার শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে সীমিত পরিসরে উত্তোলনের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে এর জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা ও কার্যকর নজরদারি অপরিহার্য।
সিলেট অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন আসন্ন বৈঠকের দিকে। কারণ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একদিকে পরিবেশ রক্ষা, অন্যদিকে হাজারো মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সরকার কী ধরনের অবস্থান নেয় এবং পাথর কোয়ারি নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতিমালা কী হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, এই বৈঠক শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। ফলে আগামী বৃহস্পতিবারের বৈঠককে ঘিরে স্থানীয় জনমনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা।


