প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভোরের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ কেঁপে উঠল সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে অনুভূত হওয়া একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে জনমনে। অনেকেই তখন ঘুমে ছিলেন, কেউবা দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ মৃদু থেকে মাঝারি ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় অসংখ্য মানুষের। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন অনেকে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় বহুতল ভবন রয়েছে সেখানে উদ্বেগ আরও বেশি ছিল।
আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ১। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মণিপুর রাজ্যের থৌবাল শহর থেকে প্রায় ৫৯ কিলোমিটার পূর্বদিকে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ৬৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার, যা তুলনামূলকভাবে গভীর হওয়ায় এর প্রভাব বিস্তৃত এলাকায় অনুভূত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কম্পনের স্থায়িত্ব ছিল কয়েক সেকেন্ড, তবে সেই স্বল্প সময়েই মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই জানান, প্রথমে হালকা দুলুনি অনুভূত হলেও কয়েক সেকেন্ড পর তা কিছুটা জোরালো হয়ে ওঠে। কেউ কেউ জানান, ঘরের দরজা-জানালা কেঁপে ওঠে, আসবাবপত্র হালকা নড়ে ওঠে। এ সময় অনেকেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় অবস্থান নেন।
ভোরবেলায় হালকা বৃষ্টির মধ্যেই অনেককে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও ভূমিকম্পটি বড় ধরনের ছিল না, তবুও পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন ও সতর্ক হয়ে উঠেছে। ফলে সামান্য কম্পনেই আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো ফাটল বা জিনিসপত্র পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে কিছু বাসিন্দা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোথাও কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে তা দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
ভূমিকম্পটি প্রথমে ইউনিভার্সাল টাইম অনুযায়ী রাত ১২টা ২৯ মিনিটে রেকর্ড করা হয়, যা বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের গভীরতা বেশি হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর হলেও এর কম্পন দূরবর্তী এলাকাতেও পৌঁছেছে। এ ধরনের ভূমিকম্প সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে না, তবে সচেতনতার অভাব থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যায়।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে একটি সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের প্রভাব বিদ্যমান। ফলে এই অঞ্চলে মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা বলে আসছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নগর পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রস্তুতি তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সিলেটের বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছোট ছোট ভূমিকম্পের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি সবসময় বড় কোনো ঘটনার পূর্বাভাস নয়, তবুও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রস্তুতি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্পের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন, কেউ আবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভবিষ্যৎ নিয়ে। অনেকেই সরকারের কাছে ভূমিকম্প মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, মঙ্গলবার ভোরের এই ভূমিকম্প বড় ধরনের ক্ষতি না করলেও মানুষের মনে এক ধরনের অজানা আতঙ্কের ছাপ রেখে গেছে। এটি আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের, যাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হলে তার ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়।


