প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার—এমনই দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নতুন লাইসেন্স প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে প্রবাসী শ্রমবাজারে শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা এলাকায় সরবি খাল থেকে কাটাগাং পর্যন্ত খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের শ্রমবাজার, প্রবাসী কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু এজেন্সি বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া চুক্তি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং বিদেশে গিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এসব অনিয়ম বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যারা এই ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
প্রবাসে কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে সরকার বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন বাধ্যতামূলক করা। মন্ত্রী বলেন, দক্ষতা ছাড়া বিদেশে গিয়ে টিকে থাকা কঠিন। তাই কর্মীদের যোগ্যতা যাচাই করে সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নিরাপদে এবং সম্মানজনকভাবে কাজ করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তাই এখন থেকেই দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা জরুরি। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা অব্যবহৃত হাইটেক পার্কগুলোকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব পার্ককে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে স্থানীয় যুবকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা হবে। এতে করে তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় শ্রমবাজারেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।
হাইটেক পার্ক নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মনে করেন, এই পার্কগুলোকে যদি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হবে।
এদিকে খাল পুনঃখনন কর্মসূচি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এটি কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং দেশের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি উদ্যোগ। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই সরকার আবারও খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যদি খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং কৃষকেরা বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। এতে করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর সময়কার খাল খনন কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সেই সময় এই উদ্যোগ দেশের কৃষি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। বর্তমান সরকারও একই ধরনের সফলতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। তাদের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ বিদেশে কাজের স্বপ্ন এখনো অনেক পরিবারের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতারণার কারণে যখন সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়, তখন তা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানসিক আঘাতও বয়ে আনে। ফলে সরকারের এই কঠোর অবস্থান অনেকের মধ্যেই নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, বরং সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। মানুষকে জানতে হবে কোন এজেন্সি বৈধ, কীভাবে যাচাই করতে হয় এবং কোথায় অভিযোগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা গেলে প্রতারণার সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
সব মিলিয়ে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর এই ঘোষণা দেশের শ্রমবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। একদিকে যেমন অসাধু এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা—দুটি বিষয়ই দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত পদক্ষেপগুলো কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।


