প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬। মাসব্যাপী এই কর্মসূচির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সরকার একদিকে যেমন শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে সিলেটের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর করতেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে নগরীর সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ প্রাঙ্গণে এই টিকাদান ক্যাম্পেইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বস্ত্র ও পাট, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সরকারের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং টিকাদান কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তিনি উল্লেখ করেন, টিকাদান কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হলে দেশের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে হাম, উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। বর্তমান ক্যাম্পেইন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মন্ত্রী বলেন, সিলেট অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা দূর করতে সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে খুব শিগগিরই সিলেটে একটি ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল চালু করা হবে। এই হাসপাতাল চালু হলে রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সেবা গ্রহণে ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সামাজিক সূচকে সিলেট এখনও পিছিয়ে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা হবে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়ন করা গেলে সামগ্রিকভাবে অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন সফল করতে সিটি কর্পোরেশন নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় হামের প্রকোপ তুলনামূলক কম হলেও শিশুদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে শিশুদের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয়ের মাধ্যমে সিলেটে একটি সফল টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. নূরে আলম শামীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা ডা. সুফি মো. খালিদ বিন লুৎফুর, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং ইউনিসেফের সিলেট ফিল্ড অফিসের প্রধান মির্জা ফজলে এলাহী।
তারা সবাই টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এই ধরনের উদ্যোগ অপরিহার্য। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই বলে তারা মত দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সচিব মো. আশিক নূর, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইয়াত এবং অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা গুলশান সিদ্দিকা।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই মাসব্যাপী ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সিলেট বিভাগে লক্ষাধিক শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নগর ও গ্রাম উভয় এলাকায় নির্ধারিত কেন্দ্রের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিকভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে শিশুদের মধ্যে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম ও রুবেলা সংক্রমণ নিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় এই ক্যাম্পেইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি এ ধরনের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে, সিলেটে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন শুধু একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, বরং এটি সরকারের বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সিলেটের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর করতে নেওয়া নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


