প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। দুই দিনব্যাপী দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ও যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া শেষে দলটি মোট ৩৬ জন নারী নেত্রীকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক অবদান, মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি দুই দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। প্রতিটি প্রার্থীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলের প্রতি অবদান এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা মূল্যায়ন করে মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। দীর্ঘ আলোচনার পর ৩৬ জনকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, বিএনপি এবার সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী বাছাইয়ে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে নারী নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া নেত্রীদের মধ্যে ছিলেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক, স্থানীয় পর্যায়ের সক্রিয় সংগঠক এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ব্যক্তিত্বরা।
চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া নারীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। একইভাবে শিরিন সুলতানা, রাশেদা বেগম হিরা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, মোছাম্মত ফরিদা ইয়াসমিন, বিলকিস ইসলাম, শাকিলা ফারজানা, হেলেন জেরিন খান এবং নিলুফার চৌধুরী মনি দলের নারী রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া মনোনয়ন তালিকায় স্থান পেয়েছেন নিপুণ রায় চৌধুরী, জেবা আমিন খান, মাহমুদা হাবিবা, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, সুলতানা আহমেদ, ফাহমিদা হক, আন্না মিঞ্জ, সুবর্ণা শিকদার, শামীম আরা বেগম স্বপ্না, শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ, বিথীকা বিনতে হুসাইন, সুরাইয়া জেরিন, মানছুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলম, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, সানজিদা ইয়াসমিন, শওকত আর আক্তার, মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা এবং রেজেকা সুলতানা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া বিএনপির ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে সংসদীয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা আরও সুসংহত করতে এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ।
অন্যদিকে সিলেট বিভাগের প্রার্থী তালিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট থেকে একাধিক নারী নেত্রী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার, সিলেট জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের বোন তাহসিন শারমিন তামান্না, সিলেট মহানগর মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ফাহিমা আহাদ কুমকুম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরীর কন্যা ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরী, প্রয়াত সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়ার কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেন এবং যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা প্রয়াত কমর উদ্দিনের কন্যা ছাবিনা খান।
এছাড়াও সুনামগঞ্জ থেকে ছালমা আক্তার, নিহার সুলতানা তিথী, বীথিকা বিনতে হোসাইন, অ্যাডভোকেট তহমীনা আকতার হাসেমী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট মুন্নী খানম (হাদিয়া চৌধুরী মুন্নি) এবং মুনমুন তালুকদারসহ একাধিক নেত্রী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। স্থানীয় পর্যায়ে এই মনোনয়নকে ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, সংরক্ষিত নারী আসনের এই মনোনয়ন শুধু একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলেরও অংশ। নারী নেতৃত্বকে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী করে ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী ব্রিফিংয়ে বলেন, বিএনপি সবসময় নারী নেতৃত্বের বিকাশে বিশ্বাসী। যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নবনির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদে গিয়ে জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংরক্ষিত নারী আসনগুলো কেবল প্রতীকী নয়, বরং জাতীয় নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিএনপির এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া দলটির ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানকেও নির্দেশ করে।
এদিকে মনোনয়নপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশের পর দলীয় অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই একে নারী নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের দিকেও আরও মনোযোগ দেওয়া যেত।
সব মিলিয়ে বিএনপির এই সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন তালিকা দলটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নারী নেতৃত্বের এই নতুন সংযোজন আগামী দিনে জাতীয় সংসদে দলটির অবস্থানকে কতটা শক্তিশালী করে তুলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখন থেকেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে।


