প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, যিনি বর্তমানে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, গত ৯ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যা ১৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ খাতে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এই কমিটি।
৬ সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং অর্থ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সচিবরা। এই সমন্বিত কাঠামোকে বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, কারণ এতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয় নিশ্চিত করা সহজ হবে।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান সংকট সমাধানের জন্য বিদ্যুতের মূল্যহার পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এ লক্ষ্যে কমিটি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব তৈরি করবে, যা পরবর্তীতে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। এই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের মূল্যহার সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে সরকারকে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই নবগঠিত কমিটির কাজ হবে এই দুই দিকের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা।
কমিটির কার্যপরিধিতে আরও বলা হয়েছে, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে, যাতে বিশেষজ্ঞ মতামত অন্তর্ভুক্ত করা যায়। পাশাপাশি, কমিটির সভা প্রয়োজন অনুসারে অনুষ্ঠিত হবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করবে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি সিলেট অঞ্চলের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, তার অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এই কমিটির কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক খাতের সঙ্গে জ্বালানি খাতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় হওয়ায় তার মতামত মূল্যবান হতে পারে।
সাধারণ জনগণের মধ্যেও এই কমিটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশা করছেন, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও যুক্তিযুক্ত কাঠামো তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে তারা আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মূল্য সমন্বয় নয়, বরং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। এই দিকগুলোও কমিটির আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কতটা বাস্তবসম্মত ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় তার ওপর। নবগঠিত এই কমিটির সুপারিশ দেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।


