প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী কাজিরবাজার অবশেষে রাষ্ট্রের মালিকানায় ফিরে এসেছে—দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সিলেট-এর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বাজার শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রই নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই পরিবর্তন কেবল মালিকানার পরিবর্তন নয়, বরং নগর উন্নয়ন ও জনকল্যাণে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে কাজিরবাজার পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, হাটবাজার নীতিমালা অনুযায়ী কোনো বাজার ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকতে পারে না; এর প্রকৃত মালিক রাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পর নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে অবশেষে সরকারের পক্ষেই চূড়ান্ত রায় আসে। এর ফলে কাজিরবাজার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রশাসক আরও জানান, সরকারের পক্ষে সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে বাজারটি এক বছরের জন্য ইজারা দিয়েছে। এই ইজারা থেকে যে রাজস্ব আয় হবে, তার একটি অংশ প্রদান করা হবে খান বাহাদুর আবু নছর মোহাম্মদ এহিয়া ওয়াক্ফ এস্টেটকে এবং অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় করা হবে নগরবাসীর কল্যাণে। এতে একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী ওয়াক্ফ সম্পত্তির অধিকার সংরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে নগর উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নিশ্চিত হবে।
কাজিরবাজারের ইতিহাস প্রসঙ্গে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খান বাহাদুর আবু নছর মোহাম্মদ এহিয়া এই বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তার পারিবারিক উপাধি ‘কাজী’ থেকে বাজারটির নামকরণ করা হয়। তিনি জনহিতকর কাজের উদ্দেশ্যে তার সম্পত্তি ওয়াক্ফ হিসেবে দান করেছিলেন, যা পরবর্তীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠে। এই ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাপট বাজারটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, খান বাহাদুরের সম্পত্তি শুধু সিলেট নগরীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। বানিয়াচং, হাকালুকি হাওর, সুনামগঞ্জ হয়ে আজমিরীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তার সম্পদের পরিধি। অতীতে সিলেট জেলার জেলা প্রশাসক এই ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। বর্তমানে এই সম্পত্তির তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার, যা এর প্রশাসনিক গুরুত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।
এই প্রেক্ষাপটে কাজিরবাজারের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে ফিরে আসা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ই নগর উন্নয়নের প্রধান উৎস। কাজিরবাজার থেকে অর্জিত আয় নগরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হবে, যা সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নগরবাসী সরাসরি উপকৃত হবে।
পরিদর্শনকালে তিনি বাজার পরিচালনায় সিটি করপোরেশন ও ইজারাদারকে সহযোগিতা করার জন্য এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান। তার মতে, একটি বাজারের সফল পরিচালনা শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে না; বরং ব্যবসায়ী, ক্রেতা এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু ও কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ সময় সিটি করপোরেশনের সচিব মো. আশিক নূর, প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেবসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী, ইজারাদার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি এই উদ্যোগের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অধিকাংশই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, যদি সঠিকভাবে বাজার পরিচালনা করা যায় এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকে, তবে এটি সবার জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। অনেকেই আশা করছেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর হয়ে একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাজিরবাজারের মতো ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেই ভূমিকা রাখে না, বরং একটি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও সমৃদ্ধ করে। তাই এই বাজারের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, কাজিরবাজার রাষ্ট্রের মালিকানায় ফিরে আসা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা থাকলে এই বাজার সিলেট নগরীর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


