প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন করে ১৫৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে সন্দেহজনক হাম ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩৫ জনে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের দৈনিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। একই তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিলেটের একাধিক সংবাদমাধ্যম। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৫৩ জনের।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুই শিশুই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে শাল্লা উপজেলার ৭ মাস বয়সী সাম্য এবং তাহিরপুর উপজেলার ২ বছর ২ মাস বয়সী ফারিহা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিভাগে হাম ও সন্দেহজনক হামের কারণে মৃত্যুর সামগ্রিক সংখ্যা আরও বেড়েছে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১৭২ জনের সবাইকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৭২ জনের মধ্যে ১০ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছিল, আর ১৬২ জনকে সন্দেহজনক হাম বা হামের উপসর্গের রোগী হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। ফলে মৃত্যুর এই পরিসংখ্যানকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু এবং সন্দেহজনক মৃত্যুর সম্মিলিত হিসাব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
জেলাভিত্তিক হিসাবেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সিলেট জেলায় এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর পরেই রয়েছে সুনামগঞ্জ, যেখানে মারা গেছেন ৬৬ জন। হবিগঞ্জে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। আর চার জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে মৌলভীবাজারে। অর্থাৎ বিভাগীয় মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ সিলেট ও সুনামগঞ্জ—এই দুই জেলাকে ঘিরে।
অন্যদিকে নিশ্চিত হাম শনাক্তের ক্ষেত্রেও জেলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৫৩ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩৮৫ জন, সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন, মৌলভীবাজারে ১৫৮ জন এবং হবিগঞ্জে ১৫৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
রোগী ভর্তির চিত্রও পরিস্থিতির চাপ বোঝাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫৮ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৩ জন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, ৪৫ জন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ৪৩ জন সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাকি রোগীরা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৫৩৫ জনের মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮৯ জন এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৬৭ জন রোগী রয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও ৭৫ জন। বাকিরা বিভাগের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালগুলোতে রোগীর এই চাপ অব্যাহত থাকায় শিশু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
সিলেট বিভাগে গত কয়েক মাস ধরেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তির সংখ্যা ওঠানামা করছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েক দিন মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা স্থির থাকার পর আবার নতুন মৃত্যুর খবর এসেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭০; পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যুতে তা ১৭২-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যাও শতাধিক রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকাশিত তথ্য থেকে আরও দেখা যায়, রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যাও প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিনে নতুন রোগী ভর্তি হওয়া এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে হাসপাতালে মোট রোগীর চাপ কমবেশি হচ্ছে। তবে বর্তমানে ৫৩৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য থেকে বোঝা যায়, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে বিভাগের প্রত্যন্ত উপজেলা ও সীমান্তবর্তী এলাকার পরিবারগুলোকে গুরুতর অসুস্থ শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর বা সিলেট নগরীর হাসপাতালে নিয়ে আসতে হচ্ছে। ফলে রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকা থেকে হাসপাতালে পৌঁছানো, ভর্তি ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিয়মিত দৈনিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ও নজরদারি অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। রোগীর সংখ্যা, নতুন ভর্তি এবং মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং অসুস্থ শিশুদের সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব বারবার সামনে আসে। তবে সিলেট বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতির ক্ষেত্রে কোন কোন কারণে রোগীর চাপ এত বেশি থাকছে, তা বুঝতে ধারাবাহিক নজরদারি ও তথ্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিশ্চিত হাম এবং সন্দেহজনক হাম—এই দুই শ্রেণির তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব।
সিলেট বিভাগে ১৭২ মৃত্যুর তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন একই সঙ্গে ৫৩৫ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হাম হিসেবে এবং ১৬২ জনের মৃত্যু সন্দেহজনক হাম বা উপসর্গের আওতায় পড়েছে। তাই পরিস্থিতির মূল্যায়নে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা, সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর তথ্য—সবগুলো সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখন স্বাস্থ্য বিভাগের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা এবং নতুন রোগীর চাপ মোকাবিলা করা। পাশাপাশি কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোন বয়সী রোগী বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর পেছনে কী ধরনের জটিলতা কাজ করছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সিলেট বিভাগের চার জেলায় হাম পরিস্থিতির এই চিত্র তাই শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়, সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তৈরি হওয়া চাপেরও একটি প্রতিফলন।


