প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইনকে আরও কার্যকরভাবে বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ আইনজীবীদের বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি ল’ ক্লিনিকের উদ্যোগে ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’ বিষয়ক একটি দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এ কর্মশালায় তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে এর ব্যবহার, আবেদন প্রক্রিয়া, আইনি কাঠামো এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বর্তমান সময়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আইন শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং আইনটির ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান এবং পেশাগত জীবনে এর কার্যকারিতা উপলব্ধি করানোর লক্ষ্যেই মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি ল’ ক্লিনিক এ কর্মশালার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল’-এর ডিন প্রফেসর শেখ আশরাফুর রহমান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, তথ্য অধিকার আইন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর আইন। একজন আইন শিক্ষার্থীকে শুধু আইনের ধারা জানা যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবে নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সেই আইন কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, সে বিষয়েও দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন। এ ধরনের কর্মশালা শিক্ষার্থীদের পেশাগত প্রস্তুতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কর্মশালার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), সিলেট-এর সভাপতি এডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার। তিনি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর পটভূমি, উদ্দেশ্য, নাগরিকের তথ্য প্রাপ্তির সাংবিধানিক ভিত্তি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইনটির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইন কেবল একটি আইনি কাঠামো নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আইনটির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির আইন ও বিচার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. এম. জেড. আশরাফুল। তিনি বলেন, আধুনিক আইন শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ, গবেষণা, আইনি বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন ব্যবহারিক কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। ল’ ক্লিনিকের এমন আয়োজন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, ডিন, বিভাগীয় প্রধান, আইন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা তথ্য অধিকার আইনকে একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়, দুর্নীতি কমে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ আরও কার্যকর হয়।
কর্মশালার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট, সিলেট-এর দলনেতা শাহরিয়ার আলম মেহেদী এবং নবনিযুক্ত দলনেতা মো. তারেক মিয়া। তাঁরা অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের তথ্য প্রাপ্তির আবেদনপত্র প্রস্তুত, আবেদন দাখিলের পদ্ধতি, তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, আপিল প্রক্রিয়া এবং বাস্তব জীবনের বিভিন্ন কেস স্টাডির মাধ্যমে আইনটির ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন। প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে কর্মশালাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা হয়।
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি ল’ ক্লিনিকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহ ফজলে ইলাহীর নেতৃত্বে ক্লিনিকটি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। গবেষণা, মুট কোর্ট, বিতর্ক, কেস স্টাডি বিশ্লেষণ, আইনি কর্মশালা এবং মেন্টরিং কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক আইন শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ক্লিনিকটি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক আইনি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই ল’ ক্লিনিকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কর্মশালার বিভিন্ন অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর মৌলিক ধারণা, আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারা, আবেদন করার নির্ধারিত পদ্ধতি, তথ্য প্রদানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, ব্যতিক্রমধর্মী তথ্যের বিধান, আপিল ব্যবস্থা এবং বাস্তব কেস বিশ্লেষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীরা কেবল আইনটির তাত্ত্বিক কাঠামো নয়, বরং বাস্তব জীবনে নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় সেবার মান উন্নত হবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ভবিষ্যতের আইনজীবী, বিচারক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এ আইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি ল’ ক্লিনিক বর্তমানে আইন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও ব্যবহারিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। ক্লিনিকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব আইনি সমস্যা বিশ্লেষণ, আইনগত পরামর্শ প্রদানের কৌশল, আইনি নথিপত্র প্রস্তুত, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতের দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল আইনজীবী গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ল’ ক্লিনিকের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইমেরিটাস ড. তৌফিক রহমান চৌধুরী এবং বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান তানভীর রহমান চৌধুরীর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও অব্যাহত সহযোগিতার কথা অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষকবৃন্দের দিকনির্দেশনা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান ক্লিনিকের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করে তুলেছে বলেও বক্তারা মত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও আইন শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণামুখী শিক্ষা এবং বাস্তবভিত্তিক আইন চর্চাকে আরও সম্প্রসারিত করতে নিয়মিতভাবে এ ধরনের কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও একাডেমিক কার্যক্রম আয়োজন করা হবে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ তাদের ভবিষ্যৎ পেশাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং আইনকে সমাজকল্যাণে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করবে।


