প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলায় বর্ণাঢ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। একই সঙ্গে কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এই অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুসরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ধান কাটার উদ্বোধন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই দুটি কর্মসূচি একসঙ্গে মিলিত হয়ে পুরো উপজেলাজুড়ে সৃষ্টি করে এক আনন্দঘন ও প্রাণবন্ত পরিবেশ।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা শুরু হয়। বৈশাখী রঙে সজ্জিত এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং স্থানীয় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শোভাযাত্রাটি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে আবার উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে এসে মিলিত হয়। পুরো সময়জুড়ে ঢাক-ঢোল, বাঁশি এবং গ্রামীণ বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
বৈশাখী শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী কৃষি সংস্কৃতির প্রদর্শনী। লাঙল, কাস্তে, হুক্কা, পিঠা তৈরির উপকরণসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র ও প্রতীকী সামগ্রী নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা শোভাযাত্রাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন। অংশগ্রহণকারীদের বর্ণিল পোশাক এবং সাংস্কৃতিক সাজসজ্জা পুরো আয়োজনকে দেয় এক ভিন্ন মাত্রা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণদের উপস্থিতিতে শোভাযাত্রাটি পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলা নববর্ষ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং কৃষিনির্ভর জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি ও কৃষিভিত্তিক জীবনধারার প্রতি আগ্রহ ও সচেতনতা তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য।
শোভাযাত্রা শেষে উপজেলা গণমিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় বাউল শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গান, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে নববর্ষের আবহকে আরও গভীর করে তোলে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও আবেগ। পরে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায়, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা বলেন, এ ধরনের আয়োজন সমাজে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলে এবং তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
নববর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি একই দিনে শাল্লায় কৃষিজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ধান কাটার মৌসুমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। শোভাযাত্রা শেষে দুপুরে দাড়াইন নদী সংলগ্ন Putiar Kanda Haor-এ এই উদ্বোধনী কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। হাওরের বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত ও পানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়, যা স্থানীয় কৃষি সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবছর শাল্লা উপজেলায় ধান উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৪৩,৩৬৮ মেট্রিক টন। একই সঙ্গে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৫,৫৭৯ মেট্রিক টন। অর্থনৈতিকভাবে এর মোট বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫১৬.১২ কোটি টাকা। এই বিশাল উৎপাদন স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, শাল্লার হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন এলাকা। প্রাকৃতিকভাবে উর্বর জমি এবং পানির সহজলভ্যতার কারণে এখানে ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আগাম বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ এবং কৃষি সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে তারা মত দেন।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, ধান কাটার মৌসুম তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বছরের পরিশ্রমের ফল এই সময়েই ঘরে তোলা যায়। তবে শ্রমিক সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা তাদের মাঝে দুশ্চিন্তা তৈরি করে। তবুও তারা আশা করছেন, এবছর ফলন ভালো হলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
উৎসব ও কৃষি উদ্বোধন ঘিরে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শাল্লা থানা পুলিশ এবং আনসার সদস্যরা পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে দায়িত্ব পালন করেন। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
স্থানীয়রা মনে করেন, একই দিনে নববর্ষ উদযাপন এবং ধান কাটার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শাল্লার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের একটি সুন্দর সমন্বয় তুলে ধরেছে। একদিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উদযাপন, অন্যদিকে কৃষির বাস্তব জীবনের সূচনা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে শাল্লা যেন এক নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, শাল্লার এবারের বৈশাখ উদযাপন কেবল একটি উৎসব নয়, বরং কৃষি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্থানীয়দের মনে দাগ কেটেছে। প্রশাসন আশা করছে, ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধভাবে অনুষ্ঠিত হবে, যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে জাতীয় পর্যায়ে আরও সুদৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করবে।


