প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশ গড়ার সংগ্রামে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছেন। ভবিষ্যতেও দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একইভাবে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁরা এ দেশের নাগরিক।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মহাখালী এবং গুলশান-বনানী এলাকার শারদীয় দুর্গাপূজার বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শনকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনও উপস্থিত ছিলেন।
দুর্গাপূজার উৎসবমুখর পরিবেশে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নাগরিক অধিকার এবং জাতীয় ঐক্যের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি অতীতের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো এসেছে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সেখানে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং দেশের প্রতি ভালোবাসা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই যুদ্ধে কারও ধর্মীয় পরিচয়কে আলাদা করে দেখা হয়নি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ সম্মিলিতভাবে লড়াই করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল সব শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মানুষের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন মানুষকে একত্র করেছিল।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে দেশে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানুষ রাজপথে নেমেছে। এসব আন্দোলনেও ধর্মীয় পরিচয় মানুষের সম্মিলিত অবস্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একই লক্ষ্যে যুক্ত করেছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ও দলমত নির্বিশেষে নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কে কোন ধর্মের অনুসারী, সেটি আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল না। দেশের মানুষ সম্মিলিতভাবে অংশ নেওয়ায় গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমানের বক্তব্যে অতীতের সংগ্রাম থেকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র গঠনের জন্য শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তিনি মনে করেন, যে ঐক্য স্বাধীনতা অর্জন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে, সেই ঐক্য দেশের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে বিভাজনের পরিবর্তে নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশকে স্বাধীন করার জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যেমন ধর্ম দেখিনি, জাত দেখিনি, ঠিক একইভাবে আগামী দিনে দেশ গড়ার সংগ্রামেও আমরা ধর্ম দেখব না। আমরা দেখব কে এই দেশের নাগরিক।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁরা সবাই এ দেশের মানুষ। দেশের ওপর একজন নাগরিকের যে অধিকার রয়েছে, অন্য নাগরিকেরও সেই অধিকার রয়েছে। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব ধর্মের মানুষ এবং বিভিন্ন পেশার নাগরিকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটি রাষ্ট্রে নাগরিকদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণে পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে সবাই সমান সুযোগ পাবেন—এমন প্রত্যাশা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা অনিরাপত্তার শিকার না হন, সে বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। গ্রাম থেকে শহর, পরিবার থেকে পাড়া-মহল্লা—বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে নানা ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় উৎসবগুলোও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। শারদীয় দুর্গাপূজা তেমনই একটি উৎসব, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ দেশে সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করেছেন। ভবিষ্যতেও যেন সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারেন, সেটিই সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।
এই বক্তব্যে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। একটি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন নাগরিক সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাজধানীতে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। রাতে প্রথমে তিনি মহাখালীর রক্ষাকালী মন্দিরের পূজামণ্ডপে যান। সেখানে পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কথা বলেন। উৎসবের আয়োজন ঘিরে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।
পরে প্রধানমন্ত্রী গুলশান-বনানী এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সেখানে উপস্থিত পূজারি ও দর্শনার্থীদের সঙ্গেও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ধর্মীয় উৎসবের সময়ে রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের এ ধরনের উপস্থিতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি উপলক্ষ তৈরি করে। একই সঙ্গে উৎসবের পরিবেশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বার্তাও সামনে আসে।
দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে আয়োজক, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। উৎসবের আনন্দ যেন সবার জন্য নিরাপদ থাকে, সে জন্য উপাসনালয় ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের চলাচল এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্প্রীতি শুধু উৎসবের সময় শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দৈনন্দিন জীবনেও নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নটি তাই শুধু বক্তব্যের বিষয় নয়, বরং বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলনও গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপদে উপাসনা করার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জন্য অপরিহার্য। একইভাবে ভিন্নমত ও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বৈষম্য এড়িয়ে চলার সামাজিক চর্চাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল সুর ছিল জাতীয় ঐক্য ও নাগরিক অধিকারের সমতা। তাঁর আহ্বান অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় যে সম্মিলিত চেতনা মানুষকে একত্র করেছিল, ভবিষ্যতে দেশ গড়ার ক্ষেত্রেও সেই চেতনা ধরে রাখা প্রয়োজন। দেশের উন্নয়ন, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে। এখন এই সম্প্রীতি ও সমান অধিকারের প্রত্যাশা বাস্তব জীবনে আরও দৃঢ় করতে নাগরিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বৈষম্যহীন আচরণ এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।


