প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের বাহুবল মডেল থানার নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী আশরাফকে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র একদিনের মাথায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর স্থলে নতুন ওসি হিসেবে মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদারকে পদায়ন করা হয়েছে। আকস্মিক এই বদলিকে ঘিরে জেলায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলী আশরাফকে নিয়ে সমালোচনা এবং তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এ সিদ্ধান্ত আসে, যা ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদের সই করা এক অফিস আদেশে আলী আশরাফকে বাহুবল মডেল থানা থেকে প্রত্যাহার করে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই আদেশে মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদারকে বাহুবল মডেল থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৫ জুলাই বাহুবল মডেল থানার তৎকালীন ওসি মো. সাইফুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। এরপর মঙ্গলবার রাতে আলী আশরাফ নতুন ওসি হিসেবে বাহুবল থানায় যোগদান করেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাঁর নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। মাত্র একদিনের ব্যবধানে তাঁকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত আসে।
স্থানীয় সূত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলী আশরাফের বিরুদ্ধে মূল বিতর্কের সূত্রপাত ২০২২ সালের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সে সময় তিনি চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিএনপি ও ছাত্রদলের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মারুফ মিয়া গুলিবিদ্ধ হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপি নেতাদের দাবি, ওই ঘটনার পর আহত মারুফ মিয়াকেই প্রধান আসামি করে মোট ৭৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং সে সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। যদিও এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি ওই সময়কার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি, ছাত্রদল এবং জামায়াতের নেতাকর্মীদের দাবি, ভিডিওটিতে তৎকালীন ওসি আলী আশরাফের নেতৃত্বে পুলিশের অভিযান পরিচালনার দৃশ্য রয়েছে। বাহুবল থানায় তাঁর যোগদানের খবর প্রকাশের পর ভিডিওটি দ্রুত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী ওই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির দাবি জানান। পাশাপাশি অতীতে বিতর্কিত অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া একজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়।
চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মারুফ মিয়া বলেন, ২০২২ সালের সেই ঘটনায় তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়েছিল বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাঁর অভিযোগ, আহত হওয়ার পরও তাঁকেই প্রধান আসামি করে ৭৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। সেই ঘটনার কারণে তিনি এবং তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন মানসিক চাপ ও ভোগান্তির মধ্যে ছিলেন। তিনি দাবি করেন, ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আলী আশরাফের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে ওসি প্রত্যাহারের কারণ বা এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পুলিশ সদস্যদের বদলি ও পদায়ন হয়ে থাকে। তবে বর্তমান ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কারণে বিষয়টি জনমনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, থানার ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অতীত রেকর্ড, জনমত এবং বিতর্কিত অভিযোগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কারণ একটি থানার নেতৃত্ব স্থানীয় জনগণের আস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের আরও মত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ভিডিও বা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্তও জরুরি। নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন হলে জনমনে বিভ্রান্তি কমবে এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থাও বাড়বে।
বর্তমানে বাহুবল মডেল থানার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন নতুন ওসি মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদার। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, তাঁর নেতৃত্বে থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত পুলিশি সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এদিকে আলী আশরাফকে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র একদিনের মধ্যে প্রত্যাহারের ঘটনাকে ঘিরে জেলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসায় বদলির প্রকৃত কারণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে কৌতূহল ও জল্পনা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

