প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার যখন ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি করছে, ঠিক সেই সময় স্বস্তির খবর নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে চাল, ডাল, তেল ও চিনিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির কার্যক্রম শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন টিসিবির ট্রাক থেকে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে কম দামে, যা ইতোমধ্যে নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
সরকারের এই বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ১১ মে থেকে এবং চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। ঈদ উপলক্ষে সাধারণ মানুষের খাদ্যপণ্যের চাপ কমাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। প্রতিদিন নগরীর অন্তত ১০টি পয়েন্টে টিসিবির ট্রাক অবস্থান করছে এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। তবে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির কারণে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হচ্ছে।
সোমবার (১৮ মে) সিলেট নগরীর ১০টি এলাকায় টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে। এলাকাগুলো হলো ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের আগপাড়া, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের উপশহর এফ ব্লক, ১ নম্বর ওয়ার্ডের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বরইকান্দি, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের শিবগঞ্জ, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের পুরাণপুল এলাকার কিনব্রিজ সংলগ্ন স্থান, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেডিকেল রোড, ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীরামপুর, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কুমাগাঁও এবং ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের চন্ডিপুল এলাকা।
এসব এলাকায় নির্ধারিত ট্রাক থেকে স্বল্পমূল্যে চার ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হবে। ক্রেতারা পাচ্ছেন ৫ কেজি করে চাল অথবা আটা, ২ লিটার সয়াবিন তেল, ১ কেজি চিনি এবং ২ কেজি মসুর ডাল। টিসিবির দাবি, বাজারমূল্যের তুলনায় এসব পণ্য অনেক কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে, ফলে একজন ক্রেতা একবারে পণ্য কিনলে অন্তত ৫০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারছেন।
সিলেট নগরীতে টিসিবির ট্রাক ঘিরে প্রতিদিন সকাল থেকেই মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজন বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে টিসিবির এই কার্যক্রম তাদের জন্য অনেক বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে যখন চাল, তেল, ডাল ও চিনির দাম বাড়তির দিকে, তখন কম মূল্যে এসব পণ্য কেনার সুযোগ অনেক পরিবারের ব্যয় কমাতে সহায়তা করছে।
নগরীর উপশহর এলাকার কয়েকজন ক্রেতা জানান, বাজারে যে দামে চাল ও তেল কিনতে হচ্ছে, সেখানে টিসিবির পণ্য কিনে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছেন। তাদের ভাষায়, সংসারের খরচ দিন দিন বাড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই সরকারিভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি তাদের জন্য বড় সহায়তা।
শুধু নিম্ন আয়ের মানুষই নন, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যেও এখন টিসিবির পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কারণ বাজারে পণ্যের দাম অস্থিতিশীল থাকায় অনেকেই ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি ভর্তুকির পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে সয়াবিন তেল ও মসুর ডালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে টিসিবির ট্রাক থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ লাইনও দেখা যাচ্ছে।
টিসিবি সূত্র জানিয়েছে, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই বিশেষ বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানো। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এই কার্যক্রম ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সমস্যার কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। এমন পরিস্থিতিতে টিসিবির মতো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সাময়িক হলেও মানুষের ভোগান্তি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সিলেটের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, সরকারি পর্যায়ে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রির ফলে বাজারে একধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়। এতে অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ কিছুটা কমে আসে। তবে তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে টিসিবির পণ্য বিক্রির স্থানগুলোতে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। কোথাও যাতে বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত ভিড় তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত পরিমাণের বেশি পণ্য কেউ যেন কিনতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যয় বাড়ে স্বাভাবিকভাবেই। এই সময় সাধারণ মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে টিসিবির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো এই সুবিধার মাধ্যমে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কিছুটা সামাল দিতে পারছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু ঈদ উপলক্ষে নয়, সারা বছরই এ ধরনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত আকারে পরিচালনা করা হোক। কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেন সহনীয় দামে পাওয়া যায়। আর সেই বাস্তবতায় টিসিবির ট্রাক এখন অনেক মানুষের কাছে স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।


