প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রকৃতির নিষ্ঠুর আঘাত আর ভূকম্পনের চরম আতঙ্কে আবারও কেঁপে উঠেছে পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র জাপান। গত সোমবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হেনেছে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ১ মাত্রার এক শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্প। অত্যন্ত শক্তিশালী এই ভূকম্পনের পরপরই দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করে দেশটির আবহাওয়া সংস্থা। বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ও ভূমিকম্প সহনশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই আকস্মিক দুর্যোগ জাপানের সাধারণ মানুষের মনে ২০১১ সালের ভয়াবহ স্মৃতি ও ক্ষতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। চারদিক থেকে আসা সতর্কবার্তায় পুরো দেশজুড়ে এক থমথমে ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এবং জাপানের সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে যে, এদিনের এই প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল সমুদ্রপৃষ্ঠের ঠিক ১০ কিলোমিটার গভীরে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা বা জেএমএ কর্তৃক প্রদত্ত প্রাথমিক তথ্যে এই ভূগর্ভস্থ গভীরতার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। সমুদ্রের তলদেশে উৎপত্তি হওয়ার কারণে এই কম্পন দ্রুত উপকূলীয় এলাকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে বড় বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোও প্রচণ্ডভাবে দুলে ওঠে, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কিত মানুষ জীবনের ভয়ে খোলা আকাশের নিচে বা রাস্তায় নেমে আসেন। ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব না মিললেও এই কম্পনের ভয়াবহতা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
ভূমিকম্প আঘাত হানার ঠিক পরপরই দেশের উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বড় ধরনের প্রাণহানি এড়াতে জরুরি সুনামি সতর্কতা জারি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী উপকূলীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ এক মিটার উচ্চতার সামুদ্রিক ঢেউ বা সুনামি আছড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এই সম্ভাব্য জলমগ্নতা ও বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে উপকূলীয় এলাকার সকল বাসিন্দাকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সব কাজ ফেলে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার তীব্র নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের জরুরি প্রশাসনিক ঘোষণা মেনে চলার জন্য মাইকিং করা হয় এবং নাগরিকদের সর্বাত্মক সতর্কাবস্থায় থাকার আহ্বান জানানো হয়, যাতে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।
জাপান সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ করে কুমামোতো, নাগাসাকি, কাগোশিমা, ফুকুওকা, সাগা, ওইতা এবং মিয়াজাকি—এই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিফেকচারের জন্য অত্যন্ত কড়া ও জরুরি ভূমিকম্পের সতর্কতা জারি করা হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অত্যন্ত জনবহুল কিউশু দ্বীপের ঠিক ওপর এবং এর আশেপাশে অবস্থিত এই অঞ্চলগুলো এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে রয়েছে। ওই এলাকার স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতসহ সকল জনসমাগমস্থল সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং গুজবে কান না দিয়ে কেবল সরকারি ও আবহাওয়া দপ্তরের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার জন্য বারবার অনুরোধ জানায়। জীবন বাঁচাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ও পাহাড়ি উঁচু এলাকার দিকে ছুটতে শুরু করেন।
উল্লেখ্য যে, জাপানের মতো একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কিছু নয়। এর আগে গত গত ২৫ জুন দেশটির উত্তরাঞ্চলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার আরেকটি মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। তবে সৌভাগ্যবশত সেই সময় কোনো ধরনের প্রাণহানি বা বড় ধরনের কোনো অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন শক্তিশালী ভূকম্পন আঘাত হানার ফলে জাপানের সাধারণ মানুষ ও ভূতাত্ত্বিক গবেষকদের মাঝে উদ্বেগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট-বড় ধাক্কা সামলিয়ে ওঠার আগেই একের পর এক এমন শক্তিশালী কম্পন দেশের সার্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ভূগোলবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, জাপান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি হিসেবে সুপরিচিত। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্বখ্যাত ‘রিং অব ফায়ার’ বা আগ্নেয় মেখলার ঠিক পশ্চিম প্রান্তে অত্যন্ত সংবেদনশীল চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপরাষ্ট্রে প্রতি বছর শত শত ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প স্বাভাবিকভাবেই অনুভূত হয়ে থাকে। বিশ্বের মোট সংঘটিত ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশই এককভাবে জাপানে ঘটে থাকে। এর বেশিরভাগই তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার ও সহনীয় হলেও, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল কোথায় এবং ভূগর্ভে ঠিক কত গভীরে এর উৎপত্তি হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই মূলত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারিত হয়।
অতীতের ভয়াবহ সব স্মৃতির কথা উল্লেখ করলে আজও শিহরিত হতে হয় সমগ্র জাতিকে। ২০১১ সালের মার্চ মাসে আঘাত হানা ৯ মাত্রার ভয়াবহ এক সমুদ্রগর্ভস্থ ভূমিকম্প এবং তার পরপরই সৃষ্ট প্রলয়ঙ্কারী সুনামিতে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন কিংবা চিরতরে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিনের সেই প্রলয় কেবল মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি, বরং দেশটির ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি। এ ছাড়া চলতি বছরের গত ২০ এপ্রিল দেশটির উত্তরাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার ফলে অন্তত ১০ জন সাধারণ মানুষ আহত হন এবং রাজধানী টোকিওর সুউচ্চ ভবনগুলোও বেশ কয়েক সেকেন্ড ধরে প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে।
সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, এ ধরনের বড় কম্পনের পর আগামী দিনে ৮ মাত্রা বা তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। যদিও পরবর্তী এক সপ্তাহ ধরে সেই বিশেষ সতর্কতা বহাল রাখার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক বিবেচনায় তা আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি জুলাই মাসের এই নতুন ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প প্রমাণ করে দিল যে জাপানের ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটগুলোর অস্থিতিশীলতা এখনো কাটেনি। যেকোনো সময় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ার জন্য দেশটির প্রশাসন ও জনগণ সর্বদা প্রস্তুত থাকে। বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও জাপানের উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং দ্রুত সাড়া প্রদানকারী উদ্ধারকারী দলগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করে যাচ্ছে, যেন সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়।


