প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বৈশাখের প্রখর রোদ আর হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সময়ে দেশের নানা অঞ্চলে গরমজনিত অস্বস্তি যেন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও মানুষ অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যায় ভুগছেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, গরমে অস্বস্তি অনুভব করা স্বাভাবিক হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের ভেতরের জটিল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে, যা অবহেলা করা একেবারেই ঠিক নয়।
Bangladesh Medical University-এর রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, গরমের অনুভূতি মানুষের মধ্যে ভিন্ন হতে পারে, তবে যদি একই পরিবেশে একজন ব্যক্তি অন্যদের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি কষ্ট পান, তাহলে সেটি শরীরের কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তার মতে, শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো ব্যাঘাত ঘটলে গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায় এবং নানা ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের সমস্যার পেছনে সবচেয়ে সাধারণ একটি কারণ হলো থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা। বিশেষ করে হাইপারথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে শরীরের বিপাকক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয় এবং স্বাভাবিকের তুলনায় গরম অনেক বেশি অসহনীয় মনে হয়। এই অবস্থায় অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অস্থিরতা এবং ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ডা. আফসানা হক নয়ন আরও জানান, থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গরমের সময় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং দৈনন্দিন কাজকর্মেও সমস্যা অনুভব করেন।
গরমে অস্বস্তি বাড়ানোর আরেকটি বড় কারণ হলো ডায়াবেটিস এবং স্নায়বিক জটিলতা। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীরের স্নায়ু এবং ঘামগ্রন্থির কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। এতে শরীর ঠিকভাবে ঘাম নির্গত করতে পারে না, যার ফলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। এই অবস্থায় সামান্য কাজেই ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা অনুভূত হয়।
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনও গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি তাপ ধরে রাখে, ফলে শরীর সহজে ঠাণ্ডা হতে পারে না। এর ফলে হাঁটা-চলা বা হালকা পরিশ্রমেও অতিরিক্ত ঘাম এবং অস্বস্তি দেখা দেয়। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই সমস্যা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া গরমে অস্বস্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং ক্লান্তি অনেক বেশি অনুভূত হয়। গরম আবহাওয়ায় এই লক্ষণগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত পরিবর্তনও গরম সহ্য করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে গেলে অনেকেই হঠাৎ করে শরীরে তীব্র গরম অনুভব করেন, যাকে ‘হট ফ্ল্যাশ’ বলা হয়। একইভাবে গর্ভাবস্থা বা মাসিক চক্রের সময় হরমোনের ওঠানামার কারণে গরম বেশি লাগতে পারে এবং অস্বস্তি বাড়ে।
শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশনও গরমে অস্বস্তি বাড়িয়ে তোলে। পর্যাপ্ত পানি না খেলে ঘাম কম হয়, ফলে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এতে গরম আরও অসহনীয় মনে হয় এবং মাথা ব্যথা বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার ওষুধ শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমে অস্বাভাবিক অস্বস্তি হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে যদি উপসর্গগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় বা প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। থাইরয়েড, ডায়াবেটিস বা রক্তস্বল্পতার মতো রোগ থাকলে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।
চিকিৎসকরা আরও পরামর্শ দেন যে গরমের সময়ে শরীরকে সুস্থ রাখতে কিছু অভ্যাস মেনে চলা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা, অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে ছাতা ব্যবহার করা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি ভিটামিন সি ও ই সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ডা. আফসানা হক নয়নের মতে, গরমে শরীরের সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, অনেকেই প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করেন, যার ফলে পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি হয়। তাই শরীরের পরিবর্তন বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরমের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। ফলে গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গরমে অস্বাভাবিক অস্বস্তি শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও হতে পারে। তাই সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণই পারে এই সমস্যা থেকে নিরাপদ রাখতে।


