প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিখোঁজের ঘটনা নতুন নয়, তবে কিছু ঘটনা সময়ের স্রোতেও মুছে যায় না। বরং বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে, আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে। সিলেট-এর রাজনীতিতে বহুল আলোচিত এমনই এক নাম এম. ইলিয়াস আলী। তার নিখোঁজ হওয়া শুধু একটি ব্যক্তির অন্তর্ধান নয়, বরং একটি সময়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও তিনটি নাম—ইফতেখার আহমদ দিনার, জুনেদ আহমদ এবং গাড়িচালক আনসার আলী—যাদের ভাগ্য আজও অজানা।
২০১২ সালের এপ্রিল মাসটি সিলেট বিএনপির জন্য যেন এক বিভীষিকাময় অধ্যায় হয়ে আছে। মাসের শুরুতেই নিখোঁজ হন দুই ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার ও জুনেদ আহমদ। এরপর তাদের সন্ধান দাবিতে সোচ্চার হন ইলিয়াস আলী। কিন্তু সেই প্রতিবাদের মাত্র কয়েকদিন পর, ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী এলাকা থেকে তিনিও নিখোঁজ হন, সঙ্গে ছিলেন তার বিশ্বস্ত গাড়িচালক আনসার আলী। এই ধারাবাহিক নিখোঁজের ঘটনা সিলেটসহ সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ঘটনার সূত্রপাত আরও কিছুটা আগে। ২০১২ সালের ২২ মার্চ সিলেট নগরীর উপশহরে ছাত্রদল নেতা মাহমুদ হোসেন শওকত হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ওই মামলার আসামি ছিলেন দিনার ও জুনেদ। ঘটনার পর তারা আত্মগোপনে চলে যান এবং আগাম জামিন নিতে ঢাকায় যান। কিন্তু ৩ এপ্রিল উত্তরা এলাকায় আত্মীয়ের বাসার সামনে থেকে সাদাপোশাকধারী ব্যক্তিরা তাদের তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়, যা রহস্যকে আরও গভীর করে তোলে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, দিনার ও জুনেদ ছিলেন ইলিয়াস আলীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী। তাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটা গুরু-শিষ্যের মতো। এই দুই নেতার নিখোঁজ হওয়া ইলিয়াস আলীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ৮ এপ্রিল সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে গেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, তাদের ফিরিয়ে না দিলে সিলেট থেকে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। কিন্তু সেই হুঁশিয়ারির মাত্র নয় দিনের মাথায় তিনিও নিখোঁজ হয়ে যান।
ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার পর সিলেট অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বিশ্বনাথ-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, হরতাল ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান অন্তত পাঁচজন। আন্দোলনের সেই তীব্রতা সময়ের সঙ্গে কমে এলেও, নিখোঁজদের পরিবারের অপেক্ষা কখনোই থামেনি।
দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই চারজনের কোনো সন্ধান না মেলায় তাদের পরিবার ও স্বজনরা এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, নতুন পরিস্থিতিতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়া যাবে। কিছু ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারও করা হয়েছে বলে খবর আসে। কিন্তু ইলিয়াস আলী, আনসার আলী, দিনার ও জুনেদের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়া কিছু সাবেক গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইলিয়াস আলীকে গুমের পর হত্যা করা হয়েছে। যদিও এই তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই বা নিশ্চিত হয়নি, তবুও এটি জনমনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—তার তিন সঙ্গীর ভাগ্যে কী ঘটেছে?
নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের বোন তাহসিন শারমিন তামান্নার কণ্ঠে আজও আশা আর বেদনার মিশেল। তিনি জানান, সরকার পরিবর্তনের পর তারা ভেবেছিলেন তাদের ভাই ফিরে আসবেন। গুম কমিশন তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছে, তদন্তও হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তবুও তারা আশা হারাননি। কারণ, এখনো পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত খারাপ খবর তারা পাননি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতারা এই ঘটনাকে রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসেবে দেখছেন। দলটির স্থানীয় নেতৃত্বের মতে, এই চারজনকে পরিকল্পিতভাবে গুম করা হয়েছে এবং এখনো তাদের সন্ধান না পাওয়া একটি বড় ব্যর্থতা। তারা এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন সত্য প্রকাশ পাবে এবং নিখোঁজদের ভাগ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নও তুলে ধরে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাউকে এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ধরে এর কোনো সমাধান না হওয়া বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করে।
আজ, এত বছর পরও ইলিয়াস আলী এবং তার তিন সঙ্গীর রহস্য অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তাদের পরিবার অপেক্ষা করছে, সমাজ প্রশ্ন করছে, আর সময় কেবল এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উত্তর এখনো অজানা—‘গুরু’ ইলিয়াসের মতোই কি তার শিষ্যদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল? নাকি কোথাও এখনো বেঁচে আছেন তারা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে।


