প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ ও আইসিসির সাবেক বিচারপতি নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, আদালতটির বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে, কারণ একই সময়ে আইনের শাসন, বিচারিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এমন কোনো ক্ষমতা থাকা উচিত নয়, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়। অন্যদিকে, আদালতটির কর্মকর্তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার চেষ্টা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। ফলে বিষয়টি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও আইসিসির মধ্যকার বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকছে না; আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকদের বিচার করার সুযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে দেবেন না। তিনি আদালতটিকে ‘বেআইনি ও বিপজ্জনক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করে জানান, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন বন্ধ করা এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সীমিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ওয়াশিংটনের অবস্থান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও স্বার্থের ওপর আদালতের সম্ভাব্য এখতিয়ার সীমিত করাই এই পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে আইসিসির পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। আদালতের উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দুর্বল করা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আদালতের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের কারণে আদালতের তদন্ত, বিচার ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে না।
আইসিসির মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক তদন্ত পরিচালনা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তিগত সেবা ব্যবহার এবং বিচারিক কার্যক্রমের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য আদালতকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। নিষেধাজ্ঞার ফলে এসব ক্ষেত্রে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে কাজের গতি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে আদালতের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আদালতটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইসিসি সব দেশের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে না। এর বিচারিক ক্ষমতা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের সদস্যপদ, স্বীকৃত এখতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্তের ওপর। এ কারণেই আদালতের ক্ষমতার পরিধি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে।
ফিলিস্তিন পরিস্থিতি ঘিরে আইসিসির কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বিরোধকে আরও তীব্র করেছে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সিদ্ধান্তের কারণে আদালতটি ওয়াশিংটনের সমালোচনার মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। ওয়াশিংটনের যুক্তি, আদালতের এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, আইসিসির সমর্থকেরা মনে করেন, গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির তদন্তের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আদালতের বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই তদন্তের উদ্যোগ নিয়ে ওয়াশিংটন আপত্তি জানিয়েছিল। পরে তদন্তটি বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, দেশটির নাগরিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারিক এখতিয়ার গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজে আদালতের সদস্য নয়। তবে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সমর্থকদের মতে, গুরুতর অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ এখতিয়ার থাকলে তদন্ত ও জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১২৫ বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্যরাষ্ট্র এই আদালতের সদস্য। ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া অন্য দেশগুলো আদালটির অন্তর্ভুক্ত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সমর্থন বজায় রাখতে চাইলে এ বিষয়ে তাদের কূটনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এদিকে নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজ্ঞ ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। নোবেল কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন পিল্লাইকে পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়ে আইনের শাসনের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে পুরস্কার ঘোষণা ও নিষেধাজ্ঞার খবর সামনে আসায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটনাদুটির মধ্যে রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞাটি সরাসরি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেওয়া হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আলাদা ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। প্রকাশিত তথ্যে নিষেধাজ্ঞার প্রধান কারণ হিসেবে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আপত্তির কথা উঠে এসেছে। তাই সময়ের এই কাকতালীয় মিল রাজনৈতিক বিতর্ককে তীব্র করলেও দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সীমিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে চারটি সাধারণ অনুমতিপত্র জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনুমতির আওতায় আদালতের টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার ব্যবহার, পেনশন পরিশোধ এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লেনদেন চালু রাখা যাবে। এই ছাড়গুলো থেকে বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রম সচল রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এসব অনুমতির আওতায় পড়বেন, তা সংশ্লিষ্ট বিধান ও শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
মার্কো রুবিও আরও বলেছেন, আইসিসি এবং এর সদস্যদেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে নিষেধাজ্ঞার পরিধিতে আরও পরিবর্তন আনা হতে পারে। একই সঙ্গে আদালতের কার্যক্রম সীমিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের কাছ থেকেও পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে। এই অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, কারণ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার ধরে রাখা—দুই বিষয়ই তাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এ বিরোধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ, আইসিসির কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার ওপর। আদালতটির সদস্যদেশগুলো যদি আর্থিক, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমে গেলে তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাবে ইউরোপীয় দেশগুলো কী অবস্থান নেয়, তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন এই আলোচনায় আইনের শাসন ও মানবাধিকারের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি কীভাবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, সদস্যরাষ্ট্রগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং ওয়াশিংটন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ কতটা গভীর হয়। এর পরিণতি শুধু একটি আন্তর্জাতিক আদালতের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।


