নেপালে বন্যা-ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ২৭০, নিখোঁজ ১৩০০

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তজুড়ে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হিমালয়ঘেঁষা একটি নদীতে কাদা ও পাথরের বিশাল ধস নেমে আসার পর নেপাল ও তিব্বতজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা। আকস্মিক এই দুর্যোগে ইতোমধ্যে ১৬৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযান জোরদার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বুধবারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোতে বহু সড়ক, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরো এলাকার সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে দুর্গত মানুষদের কাছে খাবার, পানি, চিকিৎসাসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো হেলিকপ্টার ব্যবহার করে জীবিতদের সন্ধান এবং দুর্গত এলাকায় জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

এই দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকের নিখোঁজ থাকার ঘটনা। নেপাল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্বতারোহণ ও তীর্থভ্রমণের গন্তব্য। বিশেষ করে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক, ট্র্যাকার ও তীর্থযাত্রী যাতায়াত করেন। দুর্যোগের সময় তাঁদের অনেকেই পাহাড়ি পথ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান আবারও জোরদার করা হয়েছে। নতুন করে মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুসন্ধান কার্যক্রম যত এগোবে, হতাহতের সংখ্যা তত বাড়তে পারে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ধ্বংসস্তূপ এবং প্রবল পানির স্রোতের কারণে উদ্ধারকারীদের প্রতিটি মুহূর্তে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে নিখোঁজ প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই এখনো চলমান।

দুর্যোগের বিস্তৃতি নেপালের সীমান্ত পেরিয়ে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের জিরোং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বড় আকার ধারণ করেছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা বোঝা যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে ধারণ করা ভিডিও ও ছবি থেকে। যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল পানির স্রোত এবং কাদা-পাথরের ধ্বংসাবশেষ তিব্বতের জিরোং এলাকার একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে থাকা বহু মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আকস্মিক পানির তোড়ে মানুষজন নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও পাননি বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিম্নপ্রবাহে নেপালের বিভিন্ন ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে এমন দুর্যোগ মোকাবিলা সবসময়ই কঠিন। একদিকে খাড়া পাহাড় ও সংকীর্ণ উপত্যকা, অন্যদিকে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে অনেক এলাকায় উদ্ধারকারীদের পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কোথাও সড়কের ওপর কয়েক মিটার উঁচু কাদা ও পাথর জমে গেছে। আবার কোথাও নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি উদ্ধারকারীদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। দুর্গম এলাকার মানুষদের মধ্যে খাবার ও নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় চিকিৎসাসেবা সীমিত হওয়ায় আহত ও অসুস্থদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়াও জরুরি হয়ে উঠেছে।

নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের পরিবারগুলোর মধ্যে এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নেপালে ভ্রমণে যাওয়া স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা, তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং জীবিতদের দ্রুত উদ্ধার করাই এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।

নেপাল সরকারের পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা দুর্গত এলাকায় কাজ করছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতি ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বিমান চলাচলও সবসময় নির্বিঘ্ন নয়। উদ্ধারকারী দলকে একদিকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজতে হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ভূমিধস বা আকস্মিক পানির স্রোতের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

এই দুর্যোগের প্রভাব শুধু মানবিক ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নেই। নেপালের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও তীর্থপথগুলোর একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিব্বতের লাসা ও নেপালের কাঠমান্ডুর মধ্যে যোগাযোগকারী অঞ্চল হওয়ায় এই পাহাড়ি পথটি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সড়ক ও সীমান্ত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ভারী বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বরাবরই রয়েছে। তবে একসঙ্গে এত বড় এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করছে। দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পেতে দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নিখোঁজ ১ হাজার ৫০০ মানুষের কতজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কিংবা বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকায় কেউ জীবিত আটকে থাকলে সময় যত গড়াবে, তাঁদের উদ্ধারের ঝুঁকিও তত বাড়বে। তাই উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য প্রতিটি ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নেপাল ও তিব্বতের এই বিপর্যয় একই সঙ্গে প্রকৃতির ভয়াবহ শক্তি এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। এখন মানুষের জীবন রক্ষাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। নিখোঁজদের স্বজনেরা অপেক্ষায় রয়েছেন কোনো আশাব্যঞ্জক খবরের জন্য। আর পাহাড়ের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকারীরা খুঁজে ফিরছেন জীবনের কোনো চিহ্ন। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে এই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে ফের আলোচনায় বসার আহ্বান জাতিসংঘের

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইফুরের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র, প্রশ্ন রিজভীর

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোয়াইনঘাটে ১২০৫ বোতল ফেনসিডিলসহ নারী আটক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস জাপানের

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে অর্থ ফেরাতে ৫ হাজার কোটি বরাদ্দ

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে ফের আলোচনায় বসার আহ্বান জাতিসংঘের

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইফুরের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র, প্রশ্ন রিজভীর

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোয়াইনঘাটে ১২০৫ বোতল ফেনসিডিলসহ নারী আটক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস জাপানের

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে অর্থ ফেরাতে ৫ হাজার কোটি বরাদ্দ

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

১৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবার সিলেট সফরে আসছেন রাষ্ট্রপতি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে দুই রাতে ৮ মন্দির ও ঠাকুরঘরে চুরি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আমিরাতে ৪ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল, সমাধানের চেষ্টা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ